Logo Logo

রাজাপুরে খাল পুনঃখননে ফিরছে কৃষিজমির প্রাণ, সুফল পাবে ২৪ হাজার মানুষ


Splash Image

একসময় পলি, ময়লা-আবর্জনা ও দীর্ঘদিনের অবহেলায় ভরাট হয়ে পড়েছিল ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার বিভিন্ন খাল। এতে বন্ধ হয়ে যায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতায় নষ্ট হতো ফসল, আর শুষ্ক মৌসুমে দেখা দিত তীব্র সেচ সংকট। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চরম ভোগান্তিতে পড়তেন কৃষক ও সাধারণ মানুষ।


বিজ্ঞাপন


দীর্ঘদিনের সেই দুর্ভোগ কাটিয়ে এখন নতুন সম্ভাবনার পথে এগোচ্ছে রাজাপুর। সরকারের 'সারা দেশের পুকুর-খাল উন্নয়ন (আইপিসিপি)' এবং 'জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীল পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা' প্রকল্পের আওতায় উপজেলার পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে আসার পাশাপাশি কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে সরাসরি উপকৃত হবেন ২৪ হাজারেরও বেশি মানুষ।

উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, শুক্তাগড় ইউনিয়নের ধানসিঁড়ি নদী থেকে পিংড়ি হয়ে কাঠাখালী পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার খাল পুনঃখননে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ২৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা। এ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৫ হাজার মানুষ উপকৃত হবেন।

এছাড়া সাতুরিয়া ইউনিয়নের উত্তর তারাবুনিয়া এলাকার ৮০০ মিটার খাল পুনঃখননে ব্যয় হয়েছে ১৬ লাখ টাকা, যার সুফল পাবেন প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মানুষ। রাজাপুর সদর ইউনিয়নের মরিচবুনিয়া খালের ১ হাজার ২০০ মিটার পুনঃখননে ব্যয় হয়েছে ১৪ লাখ ১৩ হাজার টাকা। এতে উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার ৫০ জন।

একই সঙ্গে তুলাতলি এলাকার ২ হাজার ৯০০ মিটার খাল পুনঃখননে ব্যয় হয়েছে ৩৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা, যার সুফল পাবেন প্রায় ২ হাজার ৫০০ মানুষ। এছাড়া রাড়িবাড়ি খালের ১ হাজার ২০০ মিটার পুনঃখননে ব্যয় হয়েছে ১৪ লাখ ৫ হাজার টাকা। এ প্রকল্পের মাধ্যমে আরও ১ হাজার ৪০০ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, খাল পুনঃখননের সুফল শুধু কৃষিতেই সীমাবদ্ধ নয়। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে আসায় দেশীয় মাছের আবাসস্থল সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন পানির সংকটে থাকা মানুষ এখন সহজেই দৈনন্দিন কাজে পানি ব্যবহার করতে পারছেন। পাশাপাশি খালের দুই পাড় দিয়ে চলাচলের সুবিধা বাড়ায় গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থারও উন্নতি হয়েছে।

স্থানীয় কৃষক রিপন সিকদার, কাদের সিকদার ও করিম বলেন, আগে খালে পানি না থাকায় জমিতে সেচ দিতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হতো। এখন সহজেই সেচের পানি পাওয়া যাবে। এতে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন বাড়বে বলে তারা আশাবাদী।

স্থানীয় বাসিন্দা শিখারানি, মনিকা রায় ও শেফালি বেগম জানান, খাল ভরাট থাকায় রান্না, গোসলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে পানির সংকট ছিল নিত্যদিনের সমস্যা। পুনঃখননের ফলে সেই দুর্ভোগ অনেকটাই কমে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরলে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বৃদ্ধি পায়, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত হয় এবং দেশীয় মাছের আবাসস্থল গড়ে ওঠে। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা কমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে। তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু খাল পুনঃখনন করলেই হবে না; ভবিষ্যতে যাতে আবার পলি জমে খাল ভরাট না হয়, সে জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

রাজাপুর উপজেলা প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদার বলেন, সরকারি নিয়ম অনুসরণ করেই খালগুলো পুনঃখনন করা হয়েছে। এর ফলে কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হবে। তিনি জানান, আইপিসিপি এবং জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীল পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায় ধানসিঁড়ি-পিংড়ি-কাঠাখালী, উত্তর তারাবুনিয়া, মরিচবুনিয়া, তুলাতলি ও রাড়িবাড়ি খালের পুনঃখনন সম্পন্ন হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এলাকার মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

একসময় যে খালগুলো ছিল দুর্ভোগের প্রতীক, পুনঃখননের পর সেগুলোই এখন কৃষক ও সাধারণ মানুষের নতুন আশার প্রতীক হয়ে উঠছে। সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে রাজাপুরের এসব খাল দীর্ঘমেয়াদে কৃষি, পরিবেশ, মৎস্যসম্পদ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পুনঃখনন করা পাঁচ খালের সংক্ষিপ্ত তথ্য:

ধানসিঁড়ি-পিংড়ি-কাঠাখালী খাল — ৭ কিলোমিটার — ব্যয় ১ কোটি ২৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা — উপকারভোগী প্রায় ৫,০০০ জন।

উত্তর তারাবুনিয়া খাল — ৮০০ মিটার — ব্যয় ১৬ লাখ টাকা — উপকারভোগী প্রায় ৩,৫০০ জন।

মরিচবুনিয়া খাল — ১,২০০ মিটার — ব্যয় ১৪ লাখ ১৩ হাজার টাকা — উপকারভোগী প্রায় ১২,০৫০ জন।

তুলাতলি খাল — ২,৯০০ মিটার — ব্যয় ৩৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা — উপকারভোগী প্রায় ২,৫০০ জন।

রাড়িবাড়ি খাল — ১,২০০ মিটার — ব্যয় ১৪ লাখ ৫ হাজার টাকা — উপকারভোগী প্রায় ১,৪০০ জন।

সব মিলিয়ে পাঁচটি প্রকল্পের মাধ্যমে ২৪ হাজারেরও বেশি মানুষ সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...