বিজ্ঞাপন
ফোন লাইনে যেন এক অদৃশ্য যুদ্ধ: ভুক্তভোগী রোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, চট্টগ্রামের নামী-দামি বেসরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে সিরিয়াল দেওয়ার প্রক্রিয়াটি সাধারণ মানুষের জন্য একটি দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট একটি সময়ে (সাধারণত সকালে বা বিকালে) সিরিয়াল নেওয়ার জন্য ফোন লাইন খোলা হয়। কিন্তু সেই নির্ধারিত সময়ে কল দেওয়া শুরু করলে লাইনে ঢোকাই অসম্ভব হয়ে পড়ে।
নগরের জিইসি মোড় এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী মো. নেজাম উদ্দিন বলেন, "আমার বৃদ্ধ বাবার হার্টের সমস্যার জন্য একজন নামকরা কার্ডিওলজিস্টের সিরিয়াল দরকার ছিল। চেম্বার থেকে বলা হয়েছে প্রতিদিন বিকেল ৪টায় ফোন করতে। আমি এবং আমার ভাই দুজনে মিলে দুইটা ফোন থেকে টানা এক ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৫০ বার কল দিয়েছি। হয় নম্বরটি ব্যস্ত দেখায়, আর যখন রিং হয় তখন কেউ ধরে না। বিকেল ৫টায় যখন একজন ফোন ধরলেন, তখন অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় জানালেন—আজকের মতো সিরিয়াল শেষ, আগামীকাল আবার ট্রাই করুন।"
দালাল চক্রের পোয়াবারো, চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে সিরিয়াল: ডিজিটাল বা টেলিফোনিক এই অব্যবস্থাপনার সুযোগ নিয়ে নগরের বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর সামনে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র। সাধারণ মানুষ ফোনে কল করে সিরিয়াল না পেলেও, এই দালালদের অতিরিক্ত টাকা দিলে অলৌকিকভাবে দ্রুত সিরিয়াল মিলে যায়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক চেম্বারের সহকারী বা বুকিং সহকারীদের সাথে এই দালাল চক্রের গোপন যোগাযোগ রয়েছে। সাধারণ রোগীদের জন্য "লাইন ব্যস্ত" বা "সিরিয়াল শেষ" বলা হলেও, দালালদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু স্লট বা সিরিয়াল বুক করে রাখা হয়। ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার সিরিয়ালের জন্য এই দালালরা রোগীদের কাছ থেকে ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছে। গ্রামীণ এলাকা বা দূর-দূরান্ত থেকে আসা অসহায় রোগীরা বাধ্য হয়ে এই বাড়তি টাকা দিয়ে সিরিয়াল কিনছেন।
ভোগান্তির মূল কারণ কী? সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এই সংকটের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা গেছে:
অপ্রতুল কল সেন্টার ব্যবস্থা: বেশিরভাগ চিকিৎসকের চেম্বারে সিরিয়াল নেওয়ার জন্য মাত্র একটি বা দুটি মোবাইল নম্বর দেওয়া থাকে। এক সাথে হাজার হাজার মানুষ কল করায় লাইন জ্যাম হয়ে যায়।
অনলাইন বুকিংয়ের অভাব: আধুনিক যুগেও চট্টগ্রামের অধিকাংশ নামকরা ডাক্তার এখনো কোনো অ্যাপস বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ডিজিটাল সিরিয়াল ব্যবস্থা চালু করেননি।
কৃত্রিম সংকট তৈরি: সিরিয়াল বুকিংয়ের দায়িত্বে থাকা সহকারীদের অবহেলা এবং নিজস্ব পরিচিত বা দালালদের সুবিধা দেওয়ার প্রবণতা।
শহরে চিকিৎসকদের অতি-কেন্দ্রীকরণ: চট্টগ্রামের সব ভালো মানের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নির্দিষ্ট কয়েকটি নামী বেসরকারি হাসপাতালে বসেন, ফলে সেখানে রোগীর চাপ ধারণক্ষমতার বাইরে চলে যায়।
রোগীদের ক্ষোভ ও বিশেষজ্ঞ মত,এই পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। চিকিৎসার মতো একটি মৌলিক অধিকার পেতে কেন এভাবে ফোনের পেছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয় করতে হবে, সেই প্রশ্ন তুলছেন সবাই।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যখাতের এই বিশৃঙ্খলা দূর করতে অবিলম্বে কেন্দ্রীয় ও জবাবদিহিতামূলক একটি ডিজিটাল বুকিং সিস্টেম চালু করা উচিত। যেখানে রোগীরা স্বচ্ছতার সাথে দেখতে পাবেন কতটি সিরিয়াল খালি আছে এবং ঘরে বসেই বুকিং করতে পারবেন। এতে যেমন দালালি বন্ধ হবে, তেমনি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও মানসিক হয়রানি কমবে।
চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক সমাজ ও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের দাবি, স্বাস্থ্য বিভাগ যেন দ্রুত এই সিরিয়াল বাণিজ্যের দিকে নজর দেয় এবং একটি আধুনিক, সহজলভ্য ও রোগী-বান্ধব সিরিয়াল পদ্ধতি নিশ্চিত করতে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে বাধ্য করে।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...