Logo Logo

গোপালগঞ্জ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্যারাসিটামল নির্ভর চিকিৎসা সেবার অভিযোগ


Splash Image

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (গোবিপ্রবি) প্রতি সেমিস্টারে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মেডিকেল ফি বাবদ আদায় করা হচ্ছে ১৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। ৯ হাজার ৩২০ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রতি সেমিস্টারে ২০০ টাকা করে এ ফি নেওয়া হয়। সে হিসাবে প্রতি ছয় মাসে মেডিকেল ফি খাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এ অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে।


বিজ্ঞাপন


তবে ফি আদায়ের বিপরীতে প্রত্যাশিত চিকিৎসাসেবা পাওয়া যাচ্ছে না—এমন অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হয়েছেন। গত সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ‘আমাদের অধিকার গোবিপ্রবি’ ফেসবুক আইডি থেকে এ-সংক্রান্ত একটি পোস্ট দেওয়ার পর তা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।

ওই পোস্টে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ, চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়ন এবং বাধ্যতামূলক মেডিকেল ফি বাতিলসহ ছয় দফা দাবি জানানো হয়।

শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—গত কয়েক বছরের মেডিকেল ফি বাবদ আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব বিশ্ববিদ্যালয়ের নোটিশ বোর্ড ও ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা; প্রয়োজনীয় ওষুধের তালিকা প্রকাশ এবং মেডিকেল সেন্টারে সেগুলোর নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা; সরকারি মেডিকেলের আদলে ৫ বা ১০ টাকার টিকিটের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা চালু করা। তা সম্ভব না হলে বাধ্যতামূলক মেডিকেল ফি বাতিল অথবা ঐচ্ছিক করার দাবি জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া চিকিৎসাসেবা না পাওয়া শিক্ষার্থীদের প্রদত্ত অর্থ ফেরত দেওয়া অথবা পরবর্তী সেমিস্টারের ফি থেকে তা সমন্বয়, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং উন্নত রেফারেল ব্যবস্থা চালুর দাবি রয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে মেডিকেল সেন্টারের সেবার মান ও আয়-ব্যয় তদারকির জন্য স্বাধীন নজরদারি কমিটি গঠনের দাবিও জানানো হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে গেলে অনেক সময় প্যারাসিটামল ছাড়া প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যায় না। জ্বর, ব্যথা, সংক্রমণ কিংবা পেটের সমস্যার মতো বিভিন্ন রোগে একই ধরনের ওষুধ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। এ কারণে অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের পরিবর্তে নিজ খরচে গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল কিংবা গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন।

শিক্ষার্থীদের এসব অভিযোগের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর ৬৮ নম্বর প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে ডেঙ্গুসহ ১৩ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণ ওষুধ ও ইনজেকশন মজুদ রয়েছে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়।

প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুন করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হয়েছে। এসব সরঞ্জাম ব্যবহার করে ৭৫ টাকায় ইসিজি, ৫৫ টাকায় ডায়াবেটিস পরীক্ষা, ২৯৫ টাকায় লিপিড প্রোফাইল, ৫৫ টাকায় এস. বিলিরুবিন (টোটাল), ৬৫ টাকায় এসজিপিটি ও এএলপি, ৩৫ টাকায় সিরাম ক্যালসিয়াম, ৯৫ টাকায় সিরাম অ্যালবুমিন, ৪৫ টাকায় এস. ক্রিয়েটিনিন, ৬৫ টাকায় রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, ১০০ টাকায় ডেঙ্গু এনএস-১ অ্যান্টিজেন টেস্ট, এস. ইউরিক অ্যাসিড এবং ২৮০ টাকায় সিবিসি টেস্ট করা যাচ্ছে।

এখন থেকে অগ্রণী ব্যাংকের বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় ০২০০০২৩৫৭৫৪০৫ নম্বর হিসাবে ফি জমা দিয়ে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও এসব সেবা নিতে পারবেন বলে জানানো হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, মেডিকেল সেন্টারে প্যারাসিটামল, অ্যান্টাসিড, মেট্রোনিডাজল, ওমিপ্রাজল, সেটিরিজিন, ফেক্সোফেনাডিন, ডক্সিসাইক্লিন, আয়রন, ভিটামিন সি ও ওআরএস ট্যাবলেটের পাশাপাশি ওমিপ্রাজল, ওরাডল, কটসন, ল্যাসিক্স, অনডানসেট্রন, ডেক্সামেথাসোন, এভিল এবং ডিএনএস, ডিএ, এন/এস ও সি/এস স্যালাইন ইনজেকশন সরবরাহ রয়েছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সিরাজউদ্দৌলা বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের বর্তমান অবস্থা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার প্রতি চরম অবহেলার উদাহরণ। প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটের পাশাপাশি সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সীমিত সময়ে চিকিৎসাসেবা চালু থাকে। ফলে বিকেল বা রাতে কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ কিংবা আহত হলে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্যও ছুটতে হয় গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতি সেমিস্টারে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকা স্টুডেন্ট ফান্ডে জমা হয়। পাশাপাশি রয়েছে সরকারি বরাদ্দ। এত অর্থ বরাদ্দের পরও প্রয়োজনের সময় চিকিৎসাসেবা না পাওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক। এসব অর্থ কোথায় ও কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তার স্বচ্ছ হিসাব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষার্থীদের অর্থ ও সরকারি বরাদ্দ থাকার পরও চিকিৎসার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে ছুটতে হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

তবে শিক্ষার্থীদের ওষুধ সংকটের অভিযোগ বাস্তবসম্মত নয় বলে দাবি করেছেন মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. নিখন চন্দ্র বালা। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা ওষুধ সরবরাহের বিষয়ে যে অভিযোগ করেছে, তা আসলে বাস্তবসম্মত নয়। ১৫ ধরনের মেডিসিন এখান থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। চার্টে এটি দেওয়া আছে। শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিমধ্যে পর্যাপ্ত মেডিসিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যদি আরও প্রয়োজন হয়, তবে মেডিকেল সেন্টার পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আসলামের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রয়োজনে আমরা আরও ওষুধ বাড়াবো।’

মেডিকেল সেন্টারের সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আসলাম বলেন, ‘আমরা মেডিকেলে শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ রেখেছি। আরও প্রয়োজন হলে এবং শিক্ষার্থীরা লিখিতভাবে জানালে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা হবে। আর শিক্ষার্থীদের দেওয়া নির্ধারিত ফি তো আমরা কাউকে ফেরত দিতে পারি না, ফি যা আসে তা প্রশাসন থেকে আসে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা মেডিকেল সেন্টারে সরকারি হাসপাতালের মতোই সাশ্রয়ী মূল্যে ডেঙ্গুসহ ১৩টি টেস্টের ব্যবস্থা করেছি। মেডিকেল সেন্টারে সেবার মান বৃদ্ধি করা হয়েছে। এখানে জরুরি বিভাগ চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দেওয়া তথ্যের মধ্যে পার্থক্য থাকায় মেডিকেল সেন্টারের সেবার মান, আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি এখনো আলোচনায় রয়েছে।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...