বিজ্ঞাপন
‘নবায়নযোগ্য শক্তি ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষির টেকসই রূপান্তর’—এই মূল প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে মঙ্গলবার (১৯ মে) ঢাকার গুলশান-২ এলাকার লেক শোর গ্র্যান্ডে দিনব্যাপী এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
যুক্তরাজ্যের গবেষণা ও উদ্ভাবন সংস্থা ‘ইউকেআরআই’ (UKRI)-এর অর্থায়নে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগে চলমান ‘স্মার্ট-সিপ প্লাস: বাংলাদেশে সৌরচালিত সেচপাম্পের উদ্বৃত্ত শক্তির বহুমুখী ব্যবহারে উদ্ভাবনী উদ্যোগ’ প্রকল্পের আওতায় এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই আয়োজনে দেশি-বিদেশি নামী গবেষক, সরকারের নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কৃষি বিশেষজ্ঞ, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি এবং মাঠ পর্যায়ের উন্নয়নকর্মীরা অংশ নেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেমের (বাউরেস) পরিচালক অধ্যাপক ড. এম হাম্মাদুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে কর্মশালার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বাকৃবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ‘স্মার্ট-সিপ প্লাস’ প্রকল্পের ইন-কান্ট্রি লিড এবং বাকৃবির কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ড. চয়ন কুমার সাহা।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সদস্য পরিচালক (ক্ষুদ্রসেচ) ও অতিরিক্ত সচিব মো. ইউসুফ আলী, বাংলাদেশে খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ডেপুটি রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. দিয়া সানু, ঢাকাস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশনের ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলর ও ডেপুটি ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর মার্টিন ডসন এবং বাকৃবির কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মজিদ। এছাড়া যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম সিটি ইউনিভার্সিটির একটি উচ্চপর্যায়ের গবেষক দল কর্মশালায় সরাসরি অংশ নেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বার্মিংহাম সিটি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও প্রকল্প প্রধান ড. লিনসি মেলভিল। তিনি তথ্য তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশে মোট পানির ব্যবহারের প্রায় ৮৬ শতাংশ সেচকাজে ব্যবহৃত হয়, যার ৭০ শতাংশই ব্যয় হয় ঐতিহ্যবাহী ধান চাষে। অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে দেশের অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ইতিমধ্যে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। এই সংকটময় প্রেক্ষাপটে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে এবং সৌরশক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতেই কাজ করছে ‘স্মার্ট-সিপ প্লাস’ প্রকল্প।
ড. লিনসি মেলভিল আরও জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৬ লাখ সেচপাম্প ব্যবহৃত হচ্ছে, যার মধ্যে প্রায় ১২ লাখই ডিজেলচালিত। এগুলো পরিবেশ দূষণ ও গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বড় ভূমিকা রাখছে। এর বিপরীতে বর্তমানে দেশে মাত্র ৩ হাজার ৪০০-এর বেশি সৌরচালিত সেচপাম্প রয়েছে। তবে সেচ মৌসুমের বাইরে বছরের একটা দীর্ঘ সময় এসব পাম্প থেকে উৎপাদিত পরিবেশবান্ধব বিদ্যুতের প্রায় ৫৭ শতাংশই অব্যবহৃত থেকে যায়। ‘স্মার্ট-সিপ প্লাস’ প্রকল্পের মাধ্যমে এই উদ্বৃত্ত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে কোল্ড স্টোরেজ পরিচালনা, ফসল শুকানো, মাড়াই, পানি বিশুদ্ধকরণ, বৈদ্যুতিক যানবাহন চার্জিং এবং গ্রামীণ পর্যায়ে কৃষিপণ্যের প্রক্রিজাতকরণ ও সংরক্ষণের সময়োপযোগী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন, পানি, শক্তি ও খাদ্য—এই তিনটি বিষয় মানুষের জীবনধারণের প্রধান চালিকাশক্তি। এগুলোর সঠিক ও যুগোপযোগী ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যতে আমাদের বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি হতে হবে। গবেষকেরা সৌরশক্তির বহুমুখী ব্যবহারের যে অসীম সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন, তা বাংলাদেশের কৃষিকে আরও টেকসই, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সৌরচালিত সেচপাম্পকে শুধু সেচের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ধান মাড়াই, ড্রায়ার, কোল্ড স্টোরেজ, ক্ষুদ্র আবহাওয়া কেন্দ্র পরিচালনা, এমনকি গ্রামীণ এলাকায় মোবাইল ও বিদ্যুৎচালিত যানবাহন চার্জিংয়েও সহজে ব্যবহার করা সম্ভব। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি অত্যন্ত টেকসই ও পরিবেশবান্ধব সমাধান।
উদ্বোধনী অধিবেশন শেষে একটি বিশেষ পোস্টার উপস্থাপনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট গবেষক ও শিক্ষার্থীরা তাদের নানাবিধ গবেষণালব্ধ তথ্য ও চিত্র তুলে ধরেন। পরবর্তীতে অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল আলমের পরিচালনায় ‘স্মার্ট-সিপ হাবস অ্যান্ড ডিজিটাল ইনোভেশন’ শীর্ষক একটি কারিগরি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভালুকা, দিনাজপুর ও চুয়াডাঙ্গায় মাঠ পর্যায়ে পরিচালিত প্রকল্পের অগ্রগতি, ডিজিটাল টুইন প্রযুক্তি এবং ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেম (ডিএসএস) সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রায়োগিক দিক সফলভাবে তুলে ধরা হয়।
উল্লেখ্য, ‘স্মার্ট-সিপ প্লাস’ প্রকল্পটি মূলত যুক্তরাজ্য সরকারের ‘আয়ারটন ফান্ড’-এর অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। প্রকল্পটি বর্তমানে যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে বার্মিংহাম সিটি ইউনিভার্সিটি (যুক্তরাজ্য), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি), ব্রাইট গ্রিন এনার্জি ফাউন্ডেশন, ওয়াটার অ্যান্ড স্যানিটেশন ফর দ্য আরবান পপুলেশন (ডব্লিউএসইউপি) এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...