বিজ্ঞাপন
পরিবেশবাদীদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৮ জুলাই পর্যন্ত গত ১৮ বছরে কক্সবাজারে পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ৩১২ জন। এর মধ্যে ৫৪ জন রোহিঙ্গা। সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে ২০১০ সালের ১৫ জুন, যখন একদিনেই ৬২ জনের মৃত্যু হয়।
টানা বৃষ্টির কারণে কক্সবাজারের পাহাড়তলী, বাদশাঘোনা, ছাত্তারঘোনা, খাজা মঞ্জিল, লারপাড়া ও টেকনাইফ্যা পাহাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভারী বর্ষণের সময় পাহাড়ে ফাটল ধরার শব্দ তাদের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ। ঝুঁকির বিষয়টি জানা থাকলেও বিকল্প আশ্রয়ের অভাবে অনেকেই বাধ্য হয়ে পাহাড়েই বসবাস করছেন।
শুধু গত এক সপ্তাহেই জেলার বিভিন্ন পাহাড়ে চার শতাধিক ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় পাঁচ মাদ্রাসাছাত্রীসহ অন্তত ২২ জন নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, বর্তমানে জেলার বিভিন্ন পাহাড়ে প্রায় তিন লাখ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছেন।
প্রতি বর্ষা মৌসুমে প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। তবে বর্ষা শেষ হলে আবারও শুরু হয় পাহাড় কাটা এবং নতুন করে অবৈধ বসতি নির্মাণ। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, ভূমিদস্যু চক্র দরিদ্র মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে পাহাড় দখল ও বিক্রি করছে। এর ফলে যেমন প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ছে, তেমনি বন উজাড় ও পরিবেশের ভারসাম্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, পুনর্বাসনের বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া পাহাড়ের অবৈধ বসতি স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করা কঠিন। তবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। গত তিন দিনে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাদশাঘোনা এলাকায় ৭০ থেকে ৮০ ফুট উঁচু একটি পাহাড়ের ঢাল, চূড়া ও পাদদেশজুড়ে অন্তত ৬০০টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। সম্প্রতি সেখানে নতুন করে পাহাড় কেটে ঘর নির্মাণের চিহ্নও পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন সিন্ডিকেট পাহাড়ি জমি দখল করে বিক্রি করছে।
পরিবেশবিষয়ক সংস্থা এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস)-এর জরিপে বলা হয়েছে, কক্সবাজার পৌরসভার পাঁচটি ওয়ার্ডের ৫১টি পাহাড়ে গত তিন দশকে ২২ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি নির্মিত হয়েছে। এসব বসতিতে দুই লাখের বেশি মানুষ বসবাস করছেন, যাদের অধিকাংশই ভাসমান শ্রমজীবী, জলবায়ু উদ্বাস্তু এবং নিম্নআয়ের মানুষ।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি করিম উল্লাহ বলেন, নির্বিচারে পাহাড় কাটার কারণে শুধু গাছপালা ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে না, পাহাড়ের স্বাভাবিক পানি ধারণক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। এর ফলে একদিকে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে কক্সবাজার শহরে জলাবদ্ধতাও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে পাহাড় দখল ও কাটার অভিযোগে পাঁচ শতাধিক দখলদারের বিরুদ্ধে ৩৪০টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২২০টি মামলা পাহাড় নিধনের অভিযোগে। এছাড়া বন বিভাগ গত এক বছরে পাহাড় কাটার অভিযোগে আরও ৩০৪টি মামলা করেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, জনবল সংকট ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে পাহাড় নিধন পুরোপুরি বন্ধ করা এখনো সম্ভব হয়নি।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...