বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি প্রকাশিত এ জরিপে জেলা পর্যায়ে আইনগত সহায়তা সেবা সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি, প্রচারণামূলক কার্যক্রম, জনগণের সম্পৃক্ততা এবং সেবা সম্প্রসারণে গৃহীত উদ্যোগের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়। এতে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে প্রথম হয়েছে কক্সবাজার, দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সুনামগঞ্জ এবং তৃতীয় হয়েছে সিরাজগঞ্জ। চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ঠাকুরগাঁও।
সরকারি লিগ্যাল এইড কার্যক্রম সম্পর্কে এখনও দেশের অনেক মানুষ পর্যাপ্তভাবে অবগত নন। বিশেষ করে দরিদ্র, অসহায় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ জানেন না যে, রাষ্ট্র তাদের জন্য বিনামূল্যে আইনগত সহায়তার ব্যবস্থা রেখেছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা লিগ্যাল এইড অফিস দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছে।
জানা গেছে, জেলা লিগ্যাল এইড অফিস নিয়মিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন পরিষদ, সরকারি দপ্তর, বাজার, গ্রাম এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতামূলক সভা, সেমিনার, উঠান বৈঠক, মতবিনিময় সভা, লিফলেট বিতরণ ও গণপ্রচারণা পরিচালনা করছে। পাশাপাশি বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমেও জনগণকে সরকারি আইনগত সহায়তা সম্পর্কে অবহিত করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের ধারাবাহিক বাস্তবায়নের ফলেই জাতীয় পর্যায়ের মূল্যায়নে ঠাকুরগাঁও সেরা জেলাগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
শুধু সচেতনতা বৃদ্ধি নয়, সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে জেলা লিগ্যাল এইড অফিস। বর্তমানে এখান থেকে তিন ধরনের প্রধান সেবা দেওয়া হচ্ছে—বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ, আদালতে মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবী নিয়োগ এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর)। এর মধ্যে এডিআর পদ্ধতি দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আদালতের বাইরে আলোচনার মাধ্যমে দুই পক্ষের সম্মতিতে বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমার পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কও অটুট থাকে। একই সঙ্গে আদালতের মামলার চাপ কমাতেও এ পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অভিযোগ গ্রহণ, মামলা পরিচালনা এবং নিষ্পত্তির হার আগের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক বছরে লিগ্যাল এইড অফিসে ৮১৪টি আবেদন জমা পড়ে, যার মধ্যে ৭১৪টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এ সময়ে প্রায় ৫ হাজার মানুষ বিভিন্ন ধরনের আইনগত সহায়তা গ্রহণ করেছেন। একই সময়ে আদালতে ২২৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে আপস-মীমাংসার ভিত্তিতে ৪৪ লাখ ৪৯ হাজার টাকা আদায় সম্ভব হয়েছে। এছাড়া ৭০৩ জন ব্যক্তি বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ গ্রহণ করেছেন। বিচারাধীন ১৯১টি মামলা আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়ায় আদালতের মামলার জটও কমেছে। বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে ১০টি সরেজমিন পরিদর্শনও করা হয়েছে।
শুধু ২০২৬ সালের জুন মাসেই লিগ্যাল এইড অফিসে মোট ১১৪টি আবেদন গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ৯৪টি আবেদন মীমাংসার জন্য গ্রহণ করা হয় এবং ৮৪টি বিরোধ সফলভাবে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়। ওই মাসে ৯৭৭ জন মানুষ বিভিন্ন ধরনের আইনগত সহায়তা পেয়েছেন। একই সময়ে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে আপসের ভিত্তিতে ১০ লাখ ৪৭ হাজার টাকা আদায় হয়েছে।
আইনগত সহায়তা সেবা ইউনিয়ন পর্যায়ে পৌঁছে দিতে জেলার পাঁচটি উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে লিগ্যাল এইড কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটিতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য, শিক্ষক, ইমাম, ধর্মীয় নেতা, গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। তারা নিজ নিজ এলাকায় সরকারি লিগ্যাল এইড সেবা সম্পর্কে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করছেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আইন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মতবিনিময় সভা, আলোচনা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করছেন জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিভিল জজ মজনু মিয়া।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার (সিভিল জজ) মজনু মিয়া বলেন, “এই অর্জন আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্ব ও অনুপ্রেরণার। সরকারি আইনগত সহায়তা সেবা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন করতে আমরা নিয়মিত বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করছি। বিচারপ্রার্থী দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ যেন সহজেই রাষ্ট্রের বিনামূল্যের আইনি সহায়তা পান, সেটিই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। ভবিষ্যতেও এই কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা হবে। আমরা চাই, অর্থের অভাবে কোনো মানুষ যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন।”
তিনি আরও বলেন, “জাতীয় পর্যায়ে এই স্বীকৃতি আমাদের দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আগামী দিনে আরও কার্যকর ও জনমুখী উদ্যোগের মাধ্যমে ঠাকুরগাঁওকে শীর্ষস্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা কাজ করে যাব।”
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...