বিজ্ঞাপন
এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ভোরে দুটি গরুসহ একজনকে আটক করার পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চুরির সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আরও দুজনকে বাড়ি থেকে ধরে আনা হয়। পরে সকালে দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলাবাজারের কাছে পালইছড়া জান্নাতুল জান্নাত জামে মসজিদের সামনে তাদের ওপর এ নির্যাতন চালানো হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
নির্যাতনের শিকার তিনজন হলেন—দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের বড়ইউড়ি গ্রামের হাসান আলীর ছেলে আবু বক্কর (৩৫), একই ইউনিয়নের পূর্ব গিলাতলী গ্রামের মৃত মফিজ আলীর ছেলে নিজাম উদ্দিন (৩০) এবং ছাতক উপজেলার নোয়ারাই ইউনিয়নের জোরাখানি গ্রামের মৃত শেরগুল মিয়ার ছেলে সোনাই মিয়া (২৫)।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার রাতে দোয়ারাবাজার উপজেলার ভক্তারপুর গ্রামের ইকবাল হোসেনের দুটি গরু চুরি হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ছাতক উপজেলার সোনাই মিয়াকে বৃহস্পতিবার ভোরে পালইছড়া এলাকার লোকজন দুটি গরুসহ আটক করেন বলে দাবি স্থানীয়দের।
পরে সোনাই মিয়ার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আবু বক্কর ও নিজাম উদ্দিনকে তাদের বাড়ি থেকে আটক করে স্থানীয় লোকজন। সকালে বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে শত শত মানুষ ঘটনাস্থলে জড়ো হন এবং সেখানে সালিসে বসার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সালিসে বাংলাবাজার ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হানিফ আলী, বিএনপি নেতা মোর্শেদ আলম, সামাদ মিয়া, রতন মিয়া ও জাকির হোসেনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও বিপুলসংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা তিনজনের হাত-পা বেঁধে নির্যাতন শুরু করে বলে অভিযোগ। এ সময় কুড়াল দিয়ে আঘাত করে আবু বক্করের ডান পা ভেঙে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে তিনজনের চোখে চুন ঢেলে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, তিনজন মাটিতে পড়ে আছেন। তাদের শরীরের পোশাক খুলে নেওয়া অবস্থায় রয়েছে এবং নাক, মুখ ও চোখে চুনজাতীয় পদার্থ লাগানো। তাদের মধ্যে একজনের পা রক্তাক্ত অবস্থায় দেখা যায়। ঘটনাস্থলে স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদেরও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
তবে ভিডিওটির সত্যতা, নির্যাতনের সঙ্গে কারা জড়িত এবং ঠিক কী পরিস্থিতিতে ঘটনাটি ঘটেছে—তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
পরে খবর পেয়ে দোয়ারাবাজার থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয়দের কাছ থেকে তিনজনকে উদ্ধার করে। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে চুরির অভিযোগে উদ্ধার হওয়া দুটি গরুও জব্দ করে পুলিশ।
ঘটনার পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গরু চুরির অভিযোগ সত্য হলেও আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে এ ধরনের নির্যাতন ও শারীরিকভাবে গুরুতর জখম করার ঘটনা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাবাজার ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হানিফ আলীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি এখন থানায় আছি, পরে ফোন দিন।” এ কথা বলেই তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
অন্যদিকে বিএনপি নেতা মোর্শেদ আলম বলেন, চোরের উৎপাতে এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ। গরু চুরি ছাড়াও মসজিদের মাইকের ব্যাটারি ও আইপিএস চুরির ঘটনা ঘটছে। তিনি দাবি করেন, গরুসহ একজনকে আটক করার পর তার তথ্য অনুযায়ী আরও দুজনকে আটক করা হয়।
তিনি আরও বলেন, “চোরদের পুলিশে দিলে জামিনে বের হয়ে যায়। তাই সালিস বোর্ডের সিদ্ধান্ত হয়েছে—চোর ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে, গণধোলাইয়ে মারা গেলেও সালিস বোর্ড তা দেখবে।”
দোয়ারাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, স্থানীয়দের হাত থেকে তিনজনকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। কোনো পক্ষের লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে গরু চুরির অভিযোগে আটক তিনজনের বিরুদ্ধে প্রকৃতপক্ষে কোনো অপরাধের প্রমাণ রয়েছে কি না এবং তাদের ওপর নির্যাতনের সঙ্গে কারা জড়িত—তা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মানবাধিকারের দিক থেকেও ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে গরু চুরির অভিযোগেরও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...