ছবিটি এআই দ্বারা নির্মিত।
বিজ্ঞাপন
বিগত বছরগুলোতে দেশের ব্যাংক খাত, জ্বালানি খাত এবং সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল। সরকারি ক্রয়ে সিন্ডিকেটের আধিপত্য এবং মেগা প্রজেক্টগুলো থেকে অর্থ আত্মসাৎ দেশের অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সূচক অনুযায়ী, দুর্নীতির শেকড় প্রশাসনের অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত। এই অবস্থায় নতুন সরকারের জন্য দুর্নীতি দমন কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং এটি রাষ্ট্রকাঠামো টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
নতুন সরকারের সামনে এখন বহুমুখী চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। এর মধ্যে অন্যতম হলো ব্যাংক ও আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করা। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ ফিরিয়ে আনা সরকারের জন্য একটি বড় ‘এসিড টেস্ট’ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি গত কয়েক দশকে প্রশাসনে যে দলীয়করণের ভিত্তি তৈরি হয়েছে, তা ভেঙে আমলাতন্ত্রে পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন ও সময়সাপেক্ষ কাজ। দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) একটি প্রকৃত স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা এখন অনিবার্য হয়ে পড়েছে।
ইতোমধ্যেই সংস্কার কমিশনগুলো কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ সরকারের কাছে পেশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সকল সংসদ সদস্য ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার বার্ষিক সম্পদ বিবরণী জনসমক্ষে প্রকাশ করা এবং সরকারি সেবায় মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ কমিয়ে ই-গভন্যান্স ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা। এছাড়া যারা দুর্নীতির তথ্য ফাঁস করবেন, সেই ‘হুইসেলব্লোয়ার’ বা তথ্যদাতাদের আইনি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অস্বচ্ছ চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জনগণের প্রধান দাবিতে পরিণত হয়েছে।
সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, শুধু আইন দিয়ে দুর্নীতি দূর করা সম্ভব নয়। যদি শীর্ষ পর্যায় থেকে শুদ্ধি অভিযান শুরু না হয় এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা না হয়, তবে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করা কঠিন হবে। ২০২৪-এর বিপ্লবের পর তরুণ প্রজন্মের মাঝে যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হয়েছে, তারা দুর্নীতির বিষয়ে আর কোনো আপস মেনে নিতে রাজি নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথ—সবখানেই এখন স্বচ্ছতার দাবি তুঙ্গে।
দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার পথটি মোটেও মসৃণ নয়। স্বার্থান্বেষী মহল এবং শক্তিশালী সিন্ডিকেট প্রতিটি পদক্ষেপে বাধা হয়ে দাঁড়াবে এটাই স্বাভাবিক। তবে সরকারের যদি দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে এবং জনগণকে সাথে নিয়ে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে, তবেই নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে। সরকারের চূড়ান্ত সফলতা নির্ভর করছে তারা কতটা সাহসিকতার সাথে এই জঞ্জাল পরিষ্কার করতে পারে তার ওপর।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...