Logo Logo

বাধ্যতামূলক বাংলা কিউআর

স্মার্ট ইকোনোমিক আড়ালে ‘ডিজিটাল দাসত্ব’ ও নজরদারির এক নীল নকশা


Splash Image

বাংলাদেশকে রাতারাতি ‘ক্যাশলেস’ বা নগদবিহীন করার এক চরম তোড়জোড় শুরু হয়েছে। সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দ্রুততম সময়ে ‘বাংলা কিউআর’ বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সরকারি ও মূলধারার গণমাধ্যমগুলো একে ‘আধুনিকতা’ ও ‘স্মার্ট বাংলাদেশের’ এক বিশাল মাইলফলক হিসেবে প্রচার করছে। দিন-রাত তুলে ধরা হচ্ছে এর খুঁটিনাটি সুবিধা। কিন্তু এই চকচকে বিজ্ঞাপনী প্রচারণার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে এক ভয়ঙ্কর অন্ধকার অধ্যায়। তড়িঘড়ি করে চাপিয়ে দেওয়া এই ব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে সাধারণ মানুষের পায়ে ‘ডিজিটাল শিকল’ পরানোর এবং নাগরিক স্বাধীনতা হরণের এক সুনিপুণ হাতিয়ার বলে মনে করছেন গভীর পর্যবেক্ষকরা।


বিজ্ঞাপন


প্রযুক্তি ও অর্থনীতির মিশেলে কীভাবে সাধারণ জনগণকে এক অদৃশ্য খাঁচায় বন্দী করার আয়োজন চলছে, তার কিছু ভয়ঙ্কর ও মারাত্মক পরিণতি নিচে তুলে ধরা হলো:

১. আর্থিক প্যানোপটিকন: চব্বিশ ঘণ্টার রাষ্ট্রীয় নজরদারি

ক্যাশলেস সমাজ মানেই আপনার ব্যক্তিগত গোপনীয়তার চিরতরে মৃত্যু। আপনি কখন, কোথায়, কার কাছ থেকে এক কাপ চা খাচ্ছেন কিংবা ওষুধ কিনছেন—তার প্রতিটি ক্লিক ও লেনদেনের ‘ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট’ জমা হবে কেন্দ্রীয় সার্ভারে। গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতাহীন এবং দলতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্রের চাদরে ঢাকা যেকোনো শাসনব্যবস্থায় এই ডেটা হবে নাগরিকদের ওপর নজরদারির সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আপনার প্রতিটি আর্থিক সিদ্ধান্তের ওপর রাষ্ট্রের এই সার্বক্ষণিক নজরদারি মূলত চীনের কুখ্যাত ‘সোশ্যাল ক্রেডিট সিস্টেমের’ কথাই মনে করিয়ে দেয়, যা নাগরিকের স্বাধীন সত্ত্বাকে ধ্বংস করে দেয়।

২. ‘একটি ক্লিক’ এবং আপনি নিঃস্ব: অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ ও কণ্ঠরোধের অস্ত্র

হাতে থাকা কাগুজে নোট বা ফিজিক্যাল ক্যাশের একটি বড় শক্তি হলো, তা আপনার সম্পূর্ণ নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে থাকে। রাষ্ট্র চাইলেই আপনার পকেটের টাকা মুহূর্তে গায়েব করতে পারে না। কিন্তু ডিজিটাল অর্থনীতিতে আপনার টাকা মূলত ব্যাংকের সার্ভারে থাকা কিছু ‘ডিজিটাল সংখ্যা’ মাত্র। কোনো ব্যক্তি সরকারের সমালোচনা করলে বা ভিন্নমত পোষণ করলে, কোনো প্রকার আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই মাত্র একটি ক্লিকের মাধ্যমে তার সমস্ত অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ বা বাজেয়াপ্ত করে দেওয়া সম্ভব। অতীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও আন্দোলনকারীদের দমনে এই আর্থিক অস্ত্র ব্যবহারের নজির রয়েছে। ক্যাশলেস সমাজে রাষ্ট্র চাইলে মুহূর্তের মধ্যে একজন জীবন্ত মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে ‘মৃত’ বানিয়ে দিতে পারবে।

৩. ইন্টারনেট শাটডাউন ও ব্ল্যাকআউট: মুহূর্তে স্তব্ধ হবে জীবন </h4>

বাংলাদেশ এখনো প্রযুক্তিগত বা অবকাঠামোগতভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। এই ভঙ্গুর অবকাঠামো নিয়ে শতভাগ ক্যাশলেস হওয়ার পরিণতি হতে পারে বিপর্যয়কর। যেকোনো রাজনৈতিক সংকট বা আন্দোলনের সময় সরকারের নির্দেশে যখন ইন্টারনেট শাটডাউন (বন্ধ) করা হবে, তখন পুরো দেশের অর্থনীতি এক সেকেন্ডে স্তব্ধ হয়ে যাবে। পকেটে বা ঘরে কোনো নগদ টাকা না থাকায় একজন সাধারণ মানুষ তীব্র সংকটের মুহূর্তে চাল, ডাল, ওষুধ বা জরুরি কোনো সেবাও কিনতে পারবে না। পুরো সমাজকে তখন এক কৃত্রিম ও মারাত্মক মানবিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেওয়া যাবে।

৪. নেগেটিভ ইন্টারেস্ট রেট: ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে আইনি ডাকাতি

ক্যাশলেস ব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অর্থনৈতিক ফাঁদ হলো ‘নেগেটিভ ইন্টারেস্ট রেট’ বা নেতিবাচক সুদের হার। যখন সমাজ থেকে নগদ টাকা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে, তখন মানুষ বাধ্য হয়ে সব টাকা ব্যাংকে রাখবে। এই সুযোগে ব্যাংক বা রাষ্ট্র যদি আপনার জমানো টাকার ওপর উল্টো চার্জ বা জরিমানা (নেগেটিভ ইন্টারেস্ট) ধার্য করে, আপনার তা মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া কোনো গতি থাকবে না। কারণ ব্যাংক থেকে ক্যাশ তুলে এনে ঘরে রাখার কোনো সুযোগ আপনার হাতে আর অবশিষ্ট থাকবে না। এটি মানুষের কষ্টার্জিত ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর এক প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি ডাকাতি।

৫. প্রান্তিক মানুষের ‘ফিন্যান্সিয়াল এক্সক্লুশন’ বা সমাজচ্যুতি

দেশের একটি বিশাল অংশের মানুষ, বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদের বয়স্ক, দিনমজুর, প্রতিবন্ধী বা চরম দরিদ্র মানুষ—যাঁরা স্মার্টফোন কিনতে পারেন না বা এই জটিল ডিজিটাল অ্যাপের ব্যবহার বোঝেন না, তাঁরা রাতারাতি সমাজ ও অর্থনীতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন (অচ্ছুত) হয়ে পড়বেন। নগদ টাকা না থাকায় তাঁরা তাঁদের শ্রমের মূল্য পাবেন না এবং কোনো কিছু কেনাকাটাও করতে পারবেন না। এই জোরপূর্বক রূপান্তর কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষকে এক চরম মানবিক সংকটের দিকে ঠেলে দেবে।

৬. ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর কর ও ক্যাশ-আউটের দ্বিগুণ শোষণ

এতদিন যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা কোনো রকমে স্বাধীনভাবে ব্যবসা করে জীবনধারণ করতেন, এই কিউআর কোডের মাধ্যমে তাঁরা অনিচ্ছাকৃতভাবেই রাষ্ট্রের কঠোর করের জালে আটকে যাবেন। শুধু তাই নয়, ক্ষুদ্র ব্যবসার সীমিত লভ্যাংশের টাকা যখন তাঁরা দিনশেষে ‘ক্যাশ আউট’ করতে যাবেন, তখন সেখান থেকেও একটি বড় অংশ মাশুল বা ফি হিসেবে কেটে নেওয়া হবে। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যাবে।

৭. সাইবার ক্রাইম ও ডিজিটাল জালিয়াতির স্বর্গরাজ্য

কাগুজে নোটের যুগে বড়জোর পকেটমার বা সীমিত ডাকাতির ভয় থাকে। কিন্তু ডিজিটাল এই স্বৈরতন্ত্রের যুগে একজন হ্যাকার বা জালিয়াতি চক্রের সামান্য একটি ক্লিকেই একজন মানুষের সারাজীবনের সমস্ত জমানো পুঁজি মুহূর্তের মধ্যে শূন্য হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে সাইবার নিরাপত্তা অত্যন্ত দুর্বল এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নেই বললেই চলে, সেখানে ডিজিটাল চুরির শিকার হলে সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার বা টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তাই থাকবে না।

৮. কর্পোরেট দাসত্ব ও মানবিক সম্পর্কের অবক্ষয়

আপনার সমস্ত আর্থিক লেনদেনের ডেটা বিশ্লেষণ করে বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ‘সার্ভেইল্যান্স ক্যাপিটালিজম’ বা নজরদারি পুঁজিবাদের মাধ্যমে আপনার রুচি ও সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করবে। আপনি নিজের অজান্তেই এই সিস্টেমের দাসে পরিণত হবেন। পাশাপাশি, সমাজে গোপনে বা অনানুষ্ঠানিকভাবে একে অপরকে আর্থিক সাহায্য বা ধার দেওয়ার যে মানবিক সংস্কৃতি রয়েছে, তাও ধ্বংস হয়ে যাবে। কারণ প্রতিটি লেনদেন ট্র্যাক হওয়ার কারণে মানুষ যেকোনো সামাজিক বা মানবিক লেনদেনে অংশ নিতে ভয় পাবে।

সচেতন নাগরিকদের মতে, ডিজিটাল এই ক্যাশলেস সোসাইটি বা বাধ্যতামূলক ‘বাংলা কিউআর’ কোনো সাধারণ অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন নয়। এটি মূলত নাগরিকের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্র ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর শতভাগ নির্ভরশীল করে তোলার এক ভয়ঙ্কর ‘ফাইন্যান্সিয়াল প্যানোপটিকন’ বা সর্বব্যাপী আর্থিক নজরদারি ব্যবস্থা। যে দেশের সুশাসন ও আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে এই ব্যবস্থা চালু হওয়া মানে সাধারণ মানুষের স্বাধীন অস্তিত্বকে চিরতরে এক ডিজিটাল স্বৈরাচারের খাঁচায় বন্দী করা।

লেখক: মো. আরাফাত রহমান,

কলামিস্ট ও সাংবাদিক,

সাবেক শিক্ষার্থী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...