Logo Logo

২৫০ শয্যার স্বপ্ন এখন ৫০ শয্যায়

কর্ণফুলীতে সরকারি হাসপাতাল নির্মাণ নিয়ে অনিশ্চয়তা


Splash Image

শিল্পায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে দ্রুত বিকাশমান দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার কর্ণফুলী উপজেলা। অথচ এই জনপদে এখনো গড়ে ওঠেনি কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল। দীর্ঘদিনের দাবির মুখে ২৫০ শয্যার একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা স্থানীয়দের আশার আলো দেখালেও, সেই স্বপ্ন এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। কারণ, বহুল আলোচিত ২৫০ শয্যার মূল প্রকল্পের পরিবর্তে বর্তমানে মাত্র ৫০ শয্যার একটি হাসপাতালের নতুন প্রস্তাবনা অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কর্ণফুলী উপজেলার ক্রসিং এলাকায় নতুন উপজেলা পরিষদ ভবনের পাশে প্রায় ৪ দশমিক ৭ একর জমিতে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত বছরের ১ জুলাই উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে নির্ধারিত জমির ল্যান্ড সার্ভেও সম্পন্ন হয়। জমি পরিমাপ ও দখল হস্তান্তরের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রাথমিক কার্যক্রমও শুরু হয়েছিল।

তবে এক বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটির ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) অনুমোদন পায়নি। ফলে হাসপাতাল নির্মাণের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে ২৫০ শয্যার পরিবর্তে ৫০ শয্যার হাসপাতালের এই নতুন প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।

কর্ণফুলী উপজেলার ওপর দিয়ে শাহ আমানত সেতু হয়ে প্রতিদিন পটিয়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়া, কক্সবাজার ও বান্দরবানগামী হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে। ফলে এই রুটে প্রায়শই ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু এলাকায় কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল না থাকায় দুর্ঘটনায় গুরুতর আহতদের জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আশঙ্কাজনক রোগীদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিংবা নগরীর দূরবর্তী অন্যান্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে এবং পথেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি শাহ আমানত সেতু এলাকায় মোটরসাইকেল ও পিকআপ ভ্যানের সংঘর্ষে বাবা-ছেলেসহ দুজন নিহত হন। এর আগে শিকলবাহা ইউনিয়নের ক্রসিং আদর্শপাড়া এলাকায় বাস ও লেগুনার সংঘর্ষে প্রাণ হারান পাঁচজন। স্থানীয়দের মতে, কর্ণফুলীতে একটি আধুনিক হাসপাতাল থাকলে সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হতো।

বর্তমানে কর্ণফুলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিজস্ব কোনো ভবন নেই। ফলে বড়উঠান ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে প্রায় ৯৪ লাখ টাকা ব্যয়ে অস্থায়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে বহির্বিভাগ চালু থাকলেও পূর্ণাঙ্গ জরুরি বিভাগ ও অন্তঃবিভাগের কোনো সুবিধা নেই। ফলস্বরূপ, জটিল রোগীদের অন্যত্র রেফার করা ছাড়া চিকিৎসকদের আর কোনো বিকল্প থাকে না।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলাটিতে বর্তমানে একজন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, দুইজন কনসালট্যান্ট এবং ১৬ জন বিসিএস চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন। তবে নার্স ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর তীব্র সংকট রয়েছে। শূন্য পদগুলো পূরণ না হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবার মানও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না।

অন্যদিকে কর্ণফুলীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে কোরিয়ান ইপিজেড, গার্মেন্টস, সিমেন্ট, ইস্পাত, ভোজ্যতেল শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অসংখ্য ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হাজারো শ্রমিক এবং উপজেলার কয়েক লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল একটি আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল।

সচেতন মহলের অভিমত, কর্ণফুলীতে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল নির্মিত হলে শুধু এই উপজেলার মানুষই নয়, বরং আনোয়ারা, পটিয়া, বাঁশখালী, চকরিয়া, চন্দনাইশ ও সাতকানিয়ার বাসিন্দারাও ব্যাপকভাবে উপকৃত হতেন। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর রোগীর অতিরিক্ত চাপ অনেকাংশে কমে যেত।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং স্বাস্থ্যসেবার ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে যেখানে ২৫০ শয্যার হাসপাতালের যৌক্তিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, সেখানে কেন সেটিকে হঠাৎ ৫০ শয্যায় সীমিত করা হলো— তা নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন উঠেছে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের বহুদিনের প্রত্যাশিত এই হাসপাতাল প্রকল্প শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখবে, নাকি প্রশাসনিক জটিলতায় আবারও ফাইলবন্দি হয়ে যাবে— সেই আশঙ্কাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে কর্ণফুলীবাসীর মনে।

এ বিষয়ে কর্ণফুলী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোছাম্মৎ জেবুন্নেসা বলেন, আগের ২৫০ শয্যার হাসপাতাল পরিকল্পনার পরিবর্তে বর্তমানে ৫০ শয্যার হাসপাতালের প্রস্তাবনা উত্থাপন করা হয়েছে। প্রায় ১০ বছর আগে উপজেলা গঠিত হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল না হওয়ায় এলাকাবাসী জরুরি স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলমের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি।

চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. শেখ ফজলে রাব্বি বলেন, আপাতত ৫০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের অধিদপ্তরের সিদ্ধান্ত রয়েছে। ২৫০ শয্যার হাসপাতাল প্রকল্প বাতিল হয়েছে কি না, সেটি অধিদপ্তরের নীতিগত বিষয়। তবে বর্তমানে ৫০ শয্যার হাসপাতালের প্রস্তাবনা নিয়েই যাবতীয় দাপ্তরিক কার্যক্রম চলছে।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...