মঙ্গলবার (৭ জুলাই), ইরানের কোম শহরের জামকারান মসজিদে লাখো শোকাহত মানুষ আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যদের জন্য জানাজার নামাজ আদায় করেন
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে চ্যানেল নিউজ এশিয়া (সিএনএ)।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানী তেহরানের মতো কোম শহরেও খামেনির জানাজার নামাজ ও শোক মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলায় আলি খামেনি ও তার পরিবারের চার সদস্য নিহত হন।
শুক্রবার (৩ জুলাই) থেকে খামেনির ৬ দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য ও জানাজার আনুষ্ঠানিকতা তেহরানে শুরু হয়। শনিবার ও রবিবার (৪-৫ জুলাই) তার মরদেহ তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়।
সোমবার (৬ জুলাই) সকালে খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যদের কফিন একটি ট্রাকে করে তেহরানের প্রধান প্রধান সড়ক হয়ে ঐতিহাসিক আজাদি স্কয়ারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। তীব্র গরম উপেক্ষা করে দেশের শীর্ষ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা এবং লাখ লাখ সাধারণ মানুষ এই শেষ বিদায় কর্মসূচিতে অংশ নেন।
প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তীব্র গরমের মধ্যে, প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ শোভাযাত্রার পথজুড়ে শোকাহত মানুষদের শরীর ঠান্ডা রাখতে ট্রাক থেকে পানি ছিটানো হয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তেহরানের এই সমাগম ১৯৮৯ সালে ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনির ঐতিহাসিক জানাজার স্মৃতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। শোক মিছিলে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষের পরনে ছিল কালো পোশাক এবং হাতে ছিল শিয়া ইসলামের প্রতিশোধের প্রতীক ‘রক্ত-লাল’ পতাকা।
শোকাতুর জনতা কফিনগুলোর ওপর ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এর মধ্যে খামেনির নাতনির ছোট কফিনটিও ছিল, যে নিহত হওয়ার সময় মাত্র ১৪ মাস বয়সী ছিল বলে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
জনগণ এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফাঁসি দাবি করে বিভিন্ন স্লোগান দেয়। কাজেমি (৬৩) নামের এক ব্যক্তি আল-জাজিরাকে দেওয়া এক মন্তব্যে বলেন, “আমরা এই অপরাধীদের (যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল) কাছ থেকে শহীদদের এবং আমাদের শহীদ নেতার রক্তের প্রতিশোধ নেব।”
মেলিকা নুরিয়ান (২২) নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বলেন, “বিশ্বের সব মানুষকে এটা দেখাতে আমি অত্যন্ত সম্মান ও গর্বের সঙ্গে এসেছি যে, আমরা তাকে (আলি খামেনি) কতটা ভালোবাসতাম এবং এই ব্যবস্থা, জনগণ ও ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতি আমরা কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
শোক মিছিলে অংশ নিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ লিখেন, “শহীদ নেতার নেতৃত্ব আমাদের শিখিয়েছে যে, ইরানের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো দেশের জনগণ ও তাদের ঐক্য।”
মিছিলে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মহসেনি এহজেই এবং কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানি।
এছাড়া গত মার্চে বিমান হামলায় নিহত আলী লারিজানির স্থলাভিষিক্ত হওয়া সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নতুন প্রধান মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর এদিন প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে আসেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, “লাল পতাকা হাতে লাখো মানুষের এই উপস্থিতি শত্রুদের প্রতি ইরানি জাতির একটি স্পষ্ট ও কঠোর বার্তা।”
টানা ছয় দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার তৃতীয় দিন অতিবাহিত হলেও, খামেনির উত্তরসূরি ও তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে এখনো জনসমক্ষে দেখা যায়নি। বাবার মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর তাকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হলেও তার এই অনুপস্থিতি নিয়ে নানা গুঞ্জন তৈরি হয়েছে। গুঞ্জন রয়েছে, বাবার সাথে ওই বিমান হামলায় তিনিও গুরুতর আহত হয়েছিলেন। আগামী বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) খামেনির নিজ শহর মাশহাদ-এ চূড়ান্ত দাফনকার্যের সময় মোজতবা উপস্থিত হন কি না, সেদিকেই এখন সবার নজর।
১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজায় অতিরিক্ত ভিড়ের চাপে যেভাবে ১০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছিল, এবার তেমন পরিস্থিতি এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ।
ইরানের জরুরি সেবা বিভাগের প্রধান জাফর মিয়াদফর জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত কোনো বিশৃঙ্খলা বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
আগামীকাল বুধবার (৮ জুলাই) ইরানের কোম থেকে খামেনির মরদেহ ইরাকে শিয়াদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ শহর নাজাফ ও কারবালায় নেওয়া হবে। এরপর বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) জন্মস্থান উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদে সমাহিত হবেন প্রয়াত এই সর্বোচ্চ নেতা।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...