বিজ্ঞাপন
ঘটনার পর সংস্থাটির মাঠকর্মী সীমা রাণী সরকার জামালগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ব্রাঞ্চ ম্যানেজার জেসমিন আক্তার ও তার স্বামী এবং আঞ্চলিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং গ্রাহকদের অর্থ উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় চার বছর আগে জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা বাজারে বিপ্লব পালের ভবনের দ্বিতীয় তলায় কার্যালয় ভাড়া নিয়ে ‘পল্লী বন্ধু উন্নয়ন সংস্থা’ তাদের কার্যক্রম শুরু করে। শুরু থেকেই উচ্চ মুনাফা ও আকর্ষণীয় সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্পে গ্রাহক সংগ্রহ করা হয়। ব্রাঞ্চ ম্যানেজার জেসমিন আক্তার এবং মাঠকর্মী সীমা রাণী সরকারের মাধ্যমে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছ থেকে ডিপিএস, ফিক্সড ডিপোজিট ও দৈনিক সঞ্চয় প্রকল্পের আওতায় বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ, তারা দীর্ঘদিন নিয়মিত কিস্তি ও সঞ্চয়ের অর্থ জমা দিলেও সম্প্রতি অনেকের সঞ্চয়ের মেয়াদ পূর্ণ হলে টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে নানা ধরনের অজুহাতের সম্মুখীন হন। কখনও কয়েকদিন অপেক্ষা করতে বলা হয়, আবার কখনও অফিসে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু গত ১৮ জুলাই সকালে গ্রাহক ও মাঠকর্মীরা কার্যালয়ে গিয়ে দেখেন অফিসে তালা ঝুলছে। এরপর থেকে ব্রাঞ্চ ম্যানেজারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
প্রতারণার বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পর গত ২০ জুলাই মাঠকর্মী সীমা রাণী সরকার জামালগঞ্জ থানায় ব্রাঞ্চ ম্যানেজার জেসমিন আক্তার, তার স্বামী এবং সংস্থাটির আঞ্চলিক কর্মকর্তা হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে ২২ জুলাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়ে ভুক্তভোগীদের অর্থ উদ্ধার এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানান।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সীমা রাণী সরকার বলেন, তিনি প্রতিদিন গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কষ্ট করে কিস্তি ও সঞ্চয়ের টাকা সংগ্রহ করে ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের কাছে জমা দিতেন। এখন অফিসে গিয়ে তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পাচ্ছেন। গ্রাহকদের সব নথিপত্র ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের কাছেই রয়েছে এবং তার কাছে কোনো টাকা বা নথি রাখার নিয়ম ছিল না। তিনিও প্রতারণার শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে প্রশাসনের কাছে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ উদ্ধার এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
সাচনা বাজারের তিতাস হোটেলের মালিক জয় দাস জানান, তিনি ১০ লাখ টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করেছিলেন। নির্ধারিত সময়ে টাকা ফেরত পাওয়ার কথা থাকলেও এখন অফিসে তালা ঝুলছে। কষ্টার্জিত অর্থ ফিরে পাবেন কি না, তা নিয়ে তিনি চরম উদ্বেগে রয়েছেন।
আরেক ভুক্তভোগী হোসাইন বলেন, তার জমাকৃত অর্থের পরিমাণ ১ লাখ ১৫ হাজার ৫৫০ টাকা। এখন সেই অর্থও ফেরত পাচ্ছেন না এবং তিনিও প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
একাধিক গ্রাহক জানান, কেউ মেয়ের বিয়ের জন্য, কেউ সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় মেটাতে, আবার কেউ ভবিষ্যতের নিরাপত্তার কথা ভেবে বছরের পর বছর সঞ্চয় করেছেন। কিন্তু এখন সেই অর্থ ফেরত না পেয়ে তারা মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েছেন। তাদের দাবি, এনজিওটির কর্মকর্তাদের বিশ্বাস করেই তারা কষ্টার্জিত অর্থ জমা দিয়েছিলেন। অথচ এখন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগেরও কোনো উপায় নেই।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার জেসমিন আক্তার ও আঞ্চলিক কর্মকর্তা হুমায়ুন কবিরের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ থাকায় তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে ‘পল্লী বন্ধু উন্নয়ন সংস্থা’র ডেপুটি ডিরেক্টর জামিনুর হক বিষয়টিকে দুঃখজনক উল্লেখ করে বলেন, গ্রাহকদের অভিযোগ তারা পেয়েছেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং অভ্যন্তরীণভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। ভুক্তভোগীদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিল্পী রাণী মোদক বলেন, লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। এনজিওটির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং ভুক্তভোগীদের অর্থ উদ্ধারে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর পুরো জামালগঞ্জ উপজেলায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রতারিত গ্রাহকরা দ্রুত তাদের কষ্টার্জিত অর্থ উদ্ধার, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট সংস্থার কার্যক্রমের ওপর যথাযথ তদারকি ও নজরদারি থাকলে সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের অর্থ নিয়ে এমন প্রতারণার ঘটনা ঘটত না। এখন প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপই ভুক্তভোগীদের একমাত্র ভরসা।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...