অভিযুক্ত বিএনপি নেতা নয়ন গোলদার।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় সূত্র জানায়, নয়ন গোলদার কাশিয়ানী উপজেলার হাতিয়াড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং রাহুথড় গ্রামের ধলা গোলদারের ছেলে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে তিনি একটি বখাটে বাহিনী গড়ে তোলেন। স্থানীয়দের দাবি, ওই দলে সাগর রায় সম্রাট, মিশন রায়, সনাতন সিকদার, জিৎ বিশ্বাস, অনিক মণ্ডল, জয় সিকদার, চয়ন বিশ্বাসসহ আরও কয়েকজন সক্রিয় ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রেম, অনৈতিক সম্পর্ক কিংবা বিভিন্ন অপবাদ দিয়ে মানুষকে আটক করে মারধর, অপমান এবং অর্থ আদায় ছিল তাদের নিয়মিত কর্মকাণ্ড।
গত ২৮ জুলাই রাহুথড় উদয়ন বিদ্যাপীঠ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী ও এক যুবককে গাছের সঙ্গে বেঁধে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। সেই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয় এবং বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসে।
এরপর রোববার (২ আগস্ট) ভোরে মাদারীপুরের রাজৈর এলাকা থেকে প্রধান অভিযুক্ত নয়ন গোলদারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অভিযুক্ত চক্রের অন্য সদস্যরা এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যায়।
ঘটনায় নির্যাতনের শিকার যুবক সূর্য বাড়ৈর বাবা শিবনাথ বাড়ৈ বাদী হয়ে কাশিয়ানী থানায় আটজনের নাম উল্লেখ এবং আরও ৫-৬ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
এদিকে ঘটনার পর থেকে নির্যাতনের শিকার স্কুলছাত্রী ও যুবকের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রোববার শিক্ষার্থীর গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বরইভিটা গ্রামের বাড়িতে গেলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আতঙ্কের চিত্র দেখা যায়। নিরাপত্তাজনিত কারণে তারা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।
তবে শিক্ষার্থীর মা জানান, তার মেয়ে বর্তমানে জীবিত ও শারীরিকভাবে সুস্থ রয়েছে। তিনি বলেন, মেয়েটি মুকসুদপুর উপজেলার ধর্মরায়ের বাড়ি গ্রামে মামার বাড়িতে থেকে রাহুথড় বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত। ঘটনার পর পারিবারিক বকাবকির জেরে সে বিষপান করেছিল। বর্তমানে মেয়ের অবস্থান সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন।
অন্যদিকে সন্ধ্যায় যুবকের বাড়িতে গেলে তার মা অসুস্থ থাকায় কথা বলতে চাননি। পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা জানান, ঘটনার বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে তারা ভয় পাচ্ছেন।
যুবকের ছোট ভাই, যিনি এসএসসি পরীক্ষার্থী, জানান—ঘটনার দিন তার ভাই বাড়ির পাশে পাট জাগ দেওয়ার কাজ করছিলেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কয়েকজন এসে তাকে জোর করে ধরে নিয়ে যায়। পরে গোলদার বাড়ি ও বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নিয়ে মারধর করা হয়। একই সময় স্কুলছাত্রীকে স্কুলে যাওয়ার পথে রাহুথড় ব্রিজ এলাকা থেকে জোরপূর্বক নামিয়ে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। সেখানে প্রায় আধা ঘণ্টা গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, নির্যাতনের পর যুবককে মুক্তি দিতে অর্থ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাদের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। পরে যুবকের মামা অপূর্ব মণ্ডল বিকাশের মাধ্যমে পাঁচ হাজার টাকা পাঠানোর পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, নির্যাতনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর অপমান ও মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে স্কুলছাত্রী বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। প্রথমে তাকে রাহুথড় উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে এবং পরে গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে পরিবারের সদস্যরা তাকে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে যান।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানান, ক্লাস চলাকালে ঘটনার সূত্রপাত হয়। ক্লাস শেষে গিয়ে তিনি দেখেন, ছেলে ও মেয়েটিকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে এবং সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হয়ে তাদের প্রকাশ্যে অপমান করছে।
বিদ্যালয়ের আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, অভিযুক্তদের ভয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না। তারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় এ ধরনের অপকর্ম চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় জড়িতদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা কমবে বলে তারা মনে করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন গ্রামবাসী অভিযোগ করেন, নয়ন গোলদার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় একটি বখাটে চক্র গড়ে তোলেন। নিরীহ মানুষকে নানা অভিযোগে ধরে এনে নির্যাতন, অপমান এবং অর্থ আদায়ের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল।
রাহুথড় উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মিডওয়াইফ মুনমুন হালদার জানান, বিষপান করা অবস্থায় এক কিশোরীকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় সেখানে আনা হয়েছিল। চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠান।
ঘটনার দিন বিদ্যালয়ের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র সহকারী শিক্ষক আনোয়ার হোসেন বলেন, তিনি নামাজ শেষে এসে দেখেন স্থানীয় ব্যক্তি নয়ন গোলদার এক ছাত্রী ও এক যুবককে বিদ্যালয়ে বসিয়ে রেখেছেন। পরে প্রধান শিক্ষককে বিষয়টি জানানো হয় এবং অভিভাবকদের ডেকে তাদের জিম্মায় দেওয়া হয়। বিদ্যালয়ে অবস্থানকালে কোনো অর্থ লেনদেন হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দেখে গাছে বেঁধে নির্যাতন ও অর্থ আদায়ের বিষয়টি জানতে পারেন বলে জানান তিনি।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইন্দ্রজিৎ সরকার বলেন, ঘটনার সময় তিনি বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন না। পরে বিষয়টি জানতে পেরে পরিচালনা কমিটির সভাপতিকে অবহিত করেন। ঊর্ধ্বতন শিক্ষা কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিকভাবে না জানানো নিজের ভুল ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।
মামলার বাদী শিবনাথ বাড়ৈ বলেন, ঘটনার সময় তিনি পাট কাটার কাজে বাইরে ছিলেন। পরে জানতে পারেন তার ছেলেকে বাড়ির সামনে থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে ছেলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও করছে না। অর্থ দাবির বিষয়ে তিনি জানান, প্রথমে ২০ হাজার টাকা দাবি করা হলেও পরে পাঁচ হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয় বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
মুকসুদপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার নাফিছুর রহমান বলেন, ঘটনাটি প্রথমে পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। পরে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওর ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়। ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রধান অভিযুক্ত নয়ন গোলদারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও জানান, জিজ্ঞাসাবাদে আরও কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে। তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পূর্বে কোনো অভিযোগ রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক পরিচয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধই তদন্তের মূল বিষয়। আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং অপরাধের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির নেতারাও তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করছেন।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...