বিজ্ঞাপন
গোপালগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অনিক পাল অন্তু এসব তথ্য জানিয়েছেন।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জানান, বোরো মৌসুমে খাদ্য মন্ত্রণালয় জেলার ছয়টি খাদ্য গুদামে ১৪ হাজার ৫৮৩ মেট্রিক টন ধান, ১৪ হাজার ৭৬ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল এবং ২৪২ মেট্রিক টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। ধানের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করা হয় প্রতি কেজি ৩৬ টাকা এবং চালের দর ৪৯ টাকা। মে মাস থেকে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয় এবং নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই ধান সংগ্রহ শেষ হয়েছে।
তিনি বলেন, আতপ ও সিদ্ধ মিলিয়ে ইতোমধ্যে ১৪ হাজার ৩১৮ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে কয়েকজন চালকল মালিকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত চাল বরাদ্দ পাওয়ায় বর্তমানে সেসব চাল সংগ্রহ করা হচ্ছে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, গোপালগঞ্জের ছয়টি খাদ্য গুদামের ৩০ শতাংশ বর্ধিত ধারণক্ষমতা ১৪ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে ধান ও চাল মিলিয়ে ইতোমধ্যে মোট ২৮ হাজার ৯০১ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা হয়েছে। অর্থাৎ গুদামের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ১৪ হাজার ৩১১ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
অনিক পাল অন্তু বলেন, খাদ্য অধিদপ্তর দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ কারণে অতিরিক্ত সংগ্রহ করা খাদ্যশস্য যেসব সরকারি গুদামে ধারণক্ষমতা বেশি রয়েছে, সেখানে পাঠানো হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য মজুত নিশ্চিত করতে গোপালগঞ্জ থেকে সংগৃহীত খাদ্যশস্য ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নারায়ণগঞ্জ সাইলো, মোংলা সাইলোসহ বিভিন্ন সরকারি গুদামে পাঠানো হয়েছে।
ধান সংগ্রহের বিষয়ে তিনি বলেন, এবার সরাসরি প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা হয়েছে। প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে একজন কৃষক সর্বোচ্চ ৩ টন ধান বিক্রি করতে পেরেছেন। ধান বিক্রির টাকা সরাসরি কৃষকের ব্যাংক হিসাবে দেওয়া হয়েছে। ধান ক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনো সিন্ডিকেটকে সক্রিয় হতে দেওয়া হয়নি। চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় পাঁচ হাজার কৃষক সরকারি খাদ্য গুদামে ধান দিয়েছেন।
এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গোপালগঞ্জ খামারবাড়ি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে জেলার পাঁচ উপজেলায় ৮২ হাজার ৫৮৮ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেখানে আবাদ হয়েছে ৮২ হাজার ৫৯৩ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১১ হেক্টর বেশি জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে।
এ মৌসুমে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৬ লাখ ৩৫ হাজার ৯২৭ মেট্রিক টন। আবাদ বৃদ্ধি ও বোরোর বাম্পার ফলনের কারণে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে উৎপাদন হয়েছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৭০৩ মেট্রিক টন ধান। এতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত ১০ হাজার ৭৭৬ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গোপালগঞ্জ খামারবাড়ির ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক সঞ্জয় কুমার কুন্ডু বলেন, জেলায় মোট ২ লাখ ৯৩ হাজার কৃষি খানাপরিবার রয়েছে। এর মধ্যে কত পরিবার বোরো ধান আবাদ করে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য তাদের দপ্তরে নেই। তবে আনুমানিক হিসাবে প্রতি হেক্টরে পাঁচজন কৃষক বোরো আবাদ করেন। সে হিসাবে জেলায় প্রায় ১৭ হাজার কৃষক বোরো ধান উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত।
তিনি বলেন, উৎপাদনের তুলনায় সরকারি পর্যায়ে খুবই অপ্রতুল পরিমাণ ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ হাজার কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা হয়েছে। ধান সংগ্রহের পরিমাণ ও কৃষকের সংখ্যা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। এতে ধানের আবাদ ও উৎপাদন আরও বাড়বে।
সরকার নির্ধারিত সংগ্রহ মূল্য বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি হওয়ায় সরকারি গুদামে ধান দিতে পেরে অনেক কৃষক খুশি হয়েছেন। তবে বরাদ্দের সীমাবদ্ধতার কারণে গুদামে ধান দিতে না পেরে অনেক কৃষক হতাশও হয়েছেন।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার রঘুনাথপুর ইউনিয়নের চরপাড়া গ্রামের কৃষক পরিমল বিশ্বাস বলেন, প্রতি কেজি ৩৬ টাকা অর্থাৎ ১ হাজার ৪৪০ টাকা মণ দরে গোপালগঞ্জ খাদ্য গুদামে ৩ টন ধান বিক্রি করতে পেরে তিনি খুবই খুশি। সরকার এভাবে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনলে তারা উপকৃত হবেন।
তিনি বলেন, এ বছর তিনি ১২ টন ধান উৎপাদন করেছেন। ধান উৎপাদনের খরচ ও সারা বছরের সংসার খরচ বাদ দেওয়ার পর অন্তত ৩ টন ধান অবশিষ্ট থাকবে। আগামীতে ৩ টনের পরিবর্তে কৃষকদের কাছ থেকে ৬ টন করে ধান নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার কাঠি ইউনিয়নের খানারপাড় গ্রামের কৃষক মাজেদ সরদার বলেন, তিনি ২১ টন ধান উৎপাদন করলেও এক কেজি ধানও সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারেননি। বাধ্য হয়ে ১ হাজার টাকা মণ দরে ফরিয়াদের কাছে ধান বিক্রি করেছেন। এতে তিনি হতাশ। আগামীতে সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে চান জানিয়ে গোপালগঞ্জে সরকারি ধান সংগ্রহ অভিযানের বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মোমিন খান খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকদের ভর্তুকি দেওয়ার পাশাপাশি সরকারি খাদ্য গুদামের সংখ্যা ও ধারণক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তিনি বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকদের ভর্তুকি দিয়ে ধানের উৎপাদন বাড়াতে হবে। গোপালগঞ্জে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হয়েছে, অথচ সংগ্রহ করা হয়েছে মাত্র ১৪ হাজার ৫৮৩ মেট্রিক টন। উৎপাদনের তুলনায় এ সংগ্রহ খুবই অপ্রতুল। তবে বর্তমান সংগ্রহের পরিমাণও খাদ্য গুদামের ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি।
মোমিন খান বলেন, কৃষকদের কাছ থেকে আরও বেশি পরিমাণে ধান সরকারি গুদামে সংগ্রহ করতে হবে। পাশাপাশি নতুন নতুন সরকারি খাদ্য গুদাম নির্মাণ করে ধান-চালের মজুত সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এতে আপৎকালীন সময়ে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ করে কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অনেকটাই সম্ভব হবে।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...