বিজ্ঞাপন
জেলার প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, গারো পাহাড়, শাল-গজারি বন, পাহাড়ি ঝরনা ও নদী, সীমান্তের নৈসর্গিক দৃশ্য, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা।
একসময় শেরপুর জেলার পর্যটনে মুখরিত থাকলেও এখন তা নেই। সময়ের ব্যবধানে এবং পর্যটন খাতে যথাযত উন্নয়নের অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে জেলার পর্যটনশিল্প।
শেরপুর জেলা ভারতের মেঘালয়ের কোল ঘেঁষে ও বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তে অরণ্যরাজি আর গারো পাহাড়ের পাদদেশে পাহাড়ি নদী ভোগাই, চেল্লাখালি, মৃগী, সোমেশ্বরী, মালিঝি, মহারশীর ঐশ্বরিক প্রাচুর্যস্নাত অববাহিকায় সমৃদ্ধ জনপদ। এই জেলার বিশাল অংশজুড়ে গারো পাহাড়ের বিস্তৃতি, লাল মাটির উঁচু পাহাড়। গহীন জঙ্গল, টিলা, মাঝে সমতল। দু’পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে ছন্দ তুলে পাহাড়ি ঝরনার ।
জেলার পর্যটনের মূল আকর্ষণ। ঝিনাইগাতীর গজনী অবকাশকেন্দ্র, নালিতাবাড়ীর মধুটিলা ইকোপার্ক, পানিহাটা-তারানি পাহাড়, শ্রীবরদীর রাজার পাহাড় ও বাবেলাকোনা, রাবারবাগানসহ বিভিন্ন স্থান পর্যটকদের আকর্ষণ করে। কিন্তু পর্যাপ্ত অবকাঠামো, আবাসন, বিনোদন ও পর্যটনসেবার ঘাটতি, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং পরিকল্পিত প্রচারণার সংকটে সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ১৯৯৩ সালে ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়নে প্রায় ৯০ একর পাহাড়ি এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে গজনী অবকাশ কেন্দ্র। জেলার সবচেয়ে পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রগুলোর একটি। পাহাড়, বন, লেক, সাইট ভিউ টাওয়ারসহ বিভিন্ন স্থাপনার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ঝুলন্ত সেতু, কেবল কার ও জিপলাইনসহ নতুন কিছু বিনোদন সুবিধা পর্যটকদের আকর্ষণ করছে।
ময়মনসিংহ বন বিভাগের ব্যবস্থাপনায় নালিতাবাড়ী উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নে মধুটিলা ফরেস্ট রেঞ্জের সমসচূড়া বন বিটের আওতায় প্রায় ৩৮০ একর বনভূমিতে গারো পাহাড়ের মনোরম পরিবেশে সরকারিভাবে ২০০০ সালে নির্মিত হয় ‘মধুটিলা ইকোর্পাক’। এই পার্কটির প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই প্রথমে চোখে পড়বে সারি সারি গাছ। রাস্তার দুইপাশে পাথর দিয়ে বানানো বিভিন্ন স্থাপনা।
অপরদিকে, যারা সবুজের কাছাকাছি যেতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য অপেক্ষা নালিতাবাড়ী উপজেলার রামজচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নের পানিহাতা। এখানে প্রকৃতি প্রেমিকদের ভিড় চোখ পড়ার মতো। গারো পাহাড়ে অবস্থিত পানিহাতায় গেলে সহজের ভারতের মেঘালয় রাজ্যের কিছু অংশ দেখা যাবে। এ স্থানটিতে এখনও পর্যটকদের জন্য কোনও পার্ক গড়ে না উঠলেও প্রকৃতি সবার মন কেড়ে নেবে।
একসময় এসব বিনোদন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, পর্যটকদের মধ্যে কেউ তুলছেন সেলফি, কেউবা নিজ ও প্রিয়জনের ছবি ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত মোবাইল ফোনে। কিন্তু সময়ে সময়ের ব্যবধানে এবং পর্যাপ্ত উন্নয়নের অভাবে এখন আগের মত আর পর্যটক আসেনা ঘুরতে।
স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, জেলার পর্যটন খাতের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গা হলো পর্যটকদের আগ্রহ। ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার ছুটিতে গজনী অবকাশকেন্দ্র ও মধুটিলা ইকোপার্কে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের সমাগমের হয়েছিল। তাই পর্যটনকেন্দ্রগুলোর প্রতি মানুষের আকর্ষণ কমেনি; বরং সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো গেলে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে রাতযাপনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় পর্যটকদের বড় একটি অংশকে দিনের মধ্যেই ফিরে যেতে হয়। কারণ পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্রগুলোর কাছাকাছি মানসম্মত আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট বা পর্যাপ্ত রাতযাপনের ব্যবস্থা নেই।
ঢাকা গাজীপুর থেকে ঘুরতে আসা জাহাঙ্গীর বলেন, আমি আগেও পরিবার নিয়ে মধুটিলা ইকোপার্কে এসেছিলাম। তখন পাহাড়ের সবুজ গাছপালা ও প্রাকৃতিক দৃশ্য খুবই ভালো লেগেছিল। কিন্তু এবার এসে দেখছি, পার্কের বিভিন্ন স্থাপনাও ভেঙে গেছে, সেগুলো নিয়মিত সংস্কার করা হচ্ছে না। সব মিলিয়ে আগের মতো ভালো লাগেনি এবার ঘুরতে এসে।
স্থানীয় সেচ্ছাসেবী রবিউল ইসলাম মন্ডল বলেন, মধুটি ইকোপার্কটি যাদের দায়িত্বে থাকে তাদের অবহেলা এবং অপ্রাসঙ্গিক কিছু নিয়মের কারণে দিন দিন পর্যটকদের উপস্থিত কমে আসছে।
তিনি আরো বলেন, গারো পাহাড় ও অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, নিরাপত্তা, আবাসন ও পরিবেশ সংরক্ষণের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে জেলার পর্যটন খাত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে পারে।
এবিষয়ে জানতে চাইলে, শেরপুর-২( নকলা-নালিতাবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য ফাহিম চৌধুরী বলেন, মধুটিলা ইকোপার্কসহ আশপাশের এলাকাকে ইতিমধ্যে অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এতে পর্যটকদের উপস্থিতি বাড়বে। পাশাপাশি হাতির নিরাপদ বিচরণ ও সংরক্ষণের জন্য সেখানে একটি অভয়ারণ্য গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রগুলোও আরও এগিয়ে যাবে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে পর্যটনবান্ধব করে গড়ে তুলতে বেশ কিছু পরিকল্পনা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে।
মধুটি ইকোপার্কের অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ে জানতে চাইলে মধুটিলা রেঞ্জকর্মকর্ত আব্দুল করিম বলেন, আমি গত বৃহস্পতিবার যোগদান করি। অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না এটা আমার জানা নাই। তবে জনবল সংকটের কারণে আমরা পর্যটকদের সেবা দিতে পারছি না। তবে পর্যটক সেবা নিতে আসলে আমরা সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে থাকি।
এ বিষয়ে শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন জানান, জেলার পর্যটন খাতকে আরও পর্যটনবান্ধব ও আকর্ষণীয় করে তুলতে ইতিমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...