Logo Logo

হুথিদের ওপর বিশাল হামলার পরিকল্পনা করছে সৌদি আরব


Splash Image

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সমন্বিত সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপকূলীয় এলাকা হুথিমুক্ত করা অথবা একাধিক ফ্রন্টে একযোগে হামলা চালানো—এই দুই কৌশলগত বিকল্প বিবেচনা করছে রিয়াদ।


বিজ্ঞাপন


আঞ্চলিক কর্মকর্তা ও পশ্চিমা কূটনীতিকদের বরাতে এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

সামরিক প্রস্তুতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছয়জন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সম্ভাব্য এই অভিযান শুরু হতে পারে। সৌদি আরবের তত্ত্বাবধানে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী স্থলযুদ্ধের নেতৃত্ব দেবে এবং সৌদি বিমানবাহিনী তাদের সরাসরি বিমান হামলার মাধ্যমে সহায়তা করবে।

নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্মকর্তারা জানান, ওয়াশিংটন রিয়াদকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ প্রধানত প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা দিলেও সৌদি আরবের কোনো মিত্র রাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধাভিযানে অংশ নেবে না।

২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে হুথিদের হাত থেকে রক্ষা করতে আরব জোটের প্রধান হিসেবে দেশটির গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে সৌদি আরব। ২০২২ সালে হওয়া অস্ত্রবিরতি মূলত চলতি বছর পর্যন্ত কার্যকর ছিল। তবে ইরান যুদ্ধের জেরে হুথিরা সৌদি আরবের পণ্যবাহী জাহাজ ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করলে পরিস্থিতি আবারও সংঘাতের দিকে মোড় নেয়।

পরিকল্পিত এই অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো গত মাসে হুথিদের আকস্মিক অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে বাব এল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা। বৈশ্বিক ও ইয়েমেনি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রিয়াদের সামনে দুটি সামরিক বিকল্প রয়েছে।

প্রথম বিকল্পের আওতায় বাব এল-মান্দেব প্রণালি ও এর সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় সীমিত আকারে অভিযান চালানো হবে। দ্বিতীয় বিকল্পটি আরও বড় পরিসরের—ইয়েমেনের আল-বায়দা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফ গভর্নরেটে একযোগে বহুমুখী হামলা চালানো। অভিযানের পরিধি অনুযায়ী যুদ্ধক্ষেত্রে এক লাখেরও বেশি ইয়েমেনি সেনা মোতায়েন করা হতে পারে।

তবে এই পরিকল্পনার বিষয়ে সৌদি ও ইয়েমেন সরকার, হুথি মুখপাত্র এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

বাব এল-মান্দেব লোহিত সাগরের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রবেশদ্বার। ভূমধ্যসাগর ও এশিয়ার মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্যে এর কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। চলতি বছর ইরান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ায় বাব এল-মান্দেবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

পশ্চিমা কূটনীতিকরা জানান, হুথিরা বাব এল-মান্দেবের মতো বৈশ্বিক কৌশলগত নৌপথ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখলে কোনো শান্তি আলোচনায় না বসার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে রিয়াদ। তবে অভিযান শুরুর নির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনও নিশ্চিত নয়। এটি এক সপ্তাহের মধ্যে শুরু হতে পারে, আবার নভেম্বরের শুরুতে অনুষ্ঠেয় মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরও শুরু হতে পারে।

সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি মনে করেন, এবারের অভিযান সীমিত পরিসরে থাকতে পারে এবং ২০১৫ সালের সর্বাত্মক অভিযানের মতো বড় আকার ধারণ নাও করতে পারে। তার মতে, হুথিদের নির্মূল করার তীব্র ইচ্ছা থাকলেও আপাতত রিয়াদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো বাব এল-মান্দেব এলাকায় আগের স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং স্বাভাবিক নৌচলাচল নিশ্চিত করা।

লেবাননে হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে পড়ার পর বর্তমানে হুথিরাই মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্রে পরিণত হয়েছে। ফলে নতুন করে এই অভিযান শুরু হলে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর থেকে চলমান আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে যেতে পারে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের পক্ষে সরাসরি বিমান হামলায় অংশ নেওয়ার মতো পদক্ষেপে জড়াতে অস্বীকৃতি জানালেও যুক্তরাষ্ট্র সৌদি বিমান হামলা পরিচালনায় সামরিক উপদেষ্টা এবং লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে।

অন্যদিকে গত মাসে সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করা তুরস্ক ও পাকিস্তান রিয়াদকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করছে।

সম্প্রতি পাকিস্তান চারটি কার্গো বিমানে করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হালকা কামান, ড্রোন ও ড্রোন-বিধ্বংসী প্রযুক্তি ইয়েমেনের অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক কেন্দ্র এডেনে পাঠিয়েছে। ইয়েমেনি বাহিনীকে সহায়তা দিতে সৌদি বাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানি সামরিক উপদেষ্টারাও মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। সৌদি আরবের কেনা তুর্কি ড্রোনও ইয়েমেনের আকাশে নজরদারি চালাচ্ছে।

অভিযান শুরু হলে হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে নিজেদের তেলক্ষেত্র ও স্থাপনাগুলো রক্ষা করাই রিয়াদের অন্যতম বড় উদ্বেগ। এ সুরক্ষায় পাকিস্তান গত বছর থেকে সাম্প্রতিক উত্তেজনা পর্যন্ত সৌদি আরবে ৩০ থেকে ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। তারা সৌদি স্থলসীমান্ত পাহারা দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার কাজে নিয়োজিত রয়েছে।

তবে ইয়েমেনের ভেতরে সরাসরি যুদ্ধক্ষম সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত পাকিস্তান নেয়নি বলে একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এ ছাড়া ফ্রান্সও সৌদি আরবের লোহিত সাগরীয় বন্দরনগরী ইয়ানবুর নিরাপত্তায় সেনা ও প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।

তবে স্থলভাগে ইয়েমেনি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভক্তি রিয়াদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিভিন্ন উপদলের ওপর নির্ভর করেই সম্ভাব্য পদাতিক অভিযান পরিচালনা করতে হবে।

সামরিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলবাশারের মতে, হুথিদের মতো সুসংগঠিত বাহিনীকে পিছু হটাতে সরকারপন্থী বাহিনীর প্রয়োজনীয় সংহতি এখনও গড়ে ওঠেনি।

গত শীতে আমিরাত-সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় বাহিনী পূর্বাঞ্চল দখলের চেষ্টা এবং বিচ্ছিন্নতার ডাক দিলে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে তাদের রক্তক্ষয়ী সংঘাত হয়। এতে সরকারপন্থী বাহিনীর ঐক্যে বড় ধরনের ফাটল তৈরি হয়।

সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী শিহাবি সতর্ক করে বলেন, এতদিন পর্যন্ত অবস্থান ধরে রাখাই ছিল মূল অগ্রাধিকার। তবে এবার পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ শুরু হতে পারে এবং পুরো অভিযানের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে স্থানীয় পদাতিক বাহিনীর সামরিক দক্ষতার ওপর।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...