Logo Logo

কোটালীপাড়ায় শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ইন্টারনেট বিলের ১০ লাখ টাকাসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ


Splash Image

অভিযুক্ত শিক্ষা কর্মকর্তা শেখর রঞ্জন ভক্ত।

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবলের মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা প্রদানের লক্ষ্যে বাস্তবায়নাধীন ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন (ইডিসি) প্রকল্পের ত্রিপক্ষীয় চুক্তিপত্রের বিধান অমান্য করে ১০ লাখ ৯২ হাজার টাকা পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শেখর রঞ্জন ভক্তের বিরুদ্ধে।


বিজ্ঞাপন


অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিধিবহির্ভূতভাবে নিজে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে ইউনিভিশন অনলাইন লিমিটেডকে (Univition Online Ltd) ওই অর্থ প্রদান করা হয়েছে। তবে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তিনি ডিডিও হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিকে বিল পরিশোধ করেছেন।

সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ১১ মার্চ বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলা থেকে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন শেখর রঞ্জন ভক্ত। এরপর থেকেই তার বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ লেনদেনে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ, বদলি বাণিজ্য, মাতৃত্বকালীন ছুটি, চিকিৎসা ছুটি ও ঐচ্ছিক ছুটি গ্রহণকারীদের কাছ থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে কৌশলে উৎকোচ গ্রহণসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকা দাবি করেছেন।

কোটালীপাড়া উপজেলায় ১৮৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ হাজার ৩৩৩ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা কর্মরত রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ শিক্ষক ও ৩০ শতাংশ শিক্ষিকা।

ইন্টারনেট বিল পরিশোধের বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শেখর রঞ্জন ভক্ত বলেন, তিনি ডিডিও হিসেবে ইউনিভিশন অনলাইন লিমিটেডকে ১০ লাখ ৯২ হাজার টাকা বিল দিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে চুক্তিতে কিছু বলা নেই এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কোনো অফিসিয়াল আদেশও নেই বলে তিনি স্বীকার করেন।

বিধিবহির্ভূতভাবে পেমেন্ট হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তাদের অনুসরণ করে বিল দিয়েছেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, “আমি আমার নিজ দায়িত্বেই বিল পরিশোধ করেছি।”

উল্লেখ্য, কোটালীপাড়ার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট সংযোগ দিয়েছে ‘কোটালীপাড়া নেট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

ইডিসি প্রকল্পের ত্রিপক্ষীয় চুক্তিপত্রের ৪(ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন হবে। সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বা ISP সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছে ই-মেইল, WhatsApp, মোবাইল এসএমএস অথবা ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিল পাঠাবে। এরপর অনুচ্ছেদ ৩ অনুযায়ী ইন্টারনেট সংযোগ প্রদানের পর প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ISP প্রতিষ্ঠানকে বিল পরিশোধ করবে।

এ বিষয়ে গোপালগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোছা. জ্যোৎস্না খাতুনের কাছে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ইন্টারনেট বিল পরিশোধের নিয়ম ও বিধিবিধান জানতে চাইলে তিনি বলেন, জেলার ইন্টারনেট সংযোগ সংক্রান্ত যে পরিমাণ অর্থ আসে, তা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা তাকে জানান না। ইন্টারনেট সংযোগের অগ্রগতির বিষয়েও তাকে অবহিত করা হয় না। এমনকি জেলায় মোট কতটি বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়েছে, সেটিও তাকে জানানো হয় না। তবে গোপালগঞ্জ জেলায় মোট ৮৬২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে বলে জানান তিনি।

কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফ-উল-আরেফীনের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, পদাধিকার বলে তিনি ইন্টারনেট প্রকল্পের সভাপতি। তবে তিনি কোটালীপাড়ায় নতুন যোগদান করেছেন। বিষয়টি তিনি প্রতিবেদকের কাছ থেকেই প্রথম জানতে পেরেছেন। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাসহ প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কাছে বিষয়টি জেনে চুক্তিপত্রের বিধিবহির্ভূত কোনো কাজ হয়ে থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

পরবর্তীতে বিষয়টি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি)কে জানানো হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না এবং প্রতিবেদকের কাছ থেকেই প্রথম জানতে পেরেছেন। একপর্যায়ে তিনি বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানানোর পরামর্শ দেন।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শেখর রঞ্জন ভক্তের বিরুদ্ধে শিক্ষিকা ইতি হালদারকে মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে বিধিবহির্ভূতভাবে ডেপুটেশনে বদলির অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগদানের পর মাত্র ছয় দিন দায়িত্ব পালন করেন। এরপর মৌখিক নির্দেশে তাকে অন্য একটি বিদ্যালয়ে যোগদান করানো হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, শিক্ষা আইনে মৌখিক ডেপুটেশনের কোনো বিধান নেই। বিষয়টি সরেজমিন তদন্ত এড়াতে তড়িঘড়ি করে একটি কথিত চিঠি তৈরি করে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছ থেকে অন্তর্বর্তীকালীন অনুমোদন নেওয়া হয়।

কোটালীপাড়া উপজেলার কান্দি ইউনিয়নের ৩২ নম্বর পশ্চিম কান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অনিল চন্দ্র রায় বলেন, বর্তমানে বিদ্যালয়ে কোনো ইন্টারনেট সংযোগ নেই। অনেক আগে একটি রাউটার দেওয়া হয়েছিল। সেটি ব্যবহার করে তারা নিজেদের খরচে ইন্টারনেট চালিয়েছেন। ইন্টারনেট বিলের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না এবং উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছ থেকে নেট খরচ বাবদ কোনো অর্থ পাননি বলে জানান।

উত্তরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দেবাশীষ রায় বলেন, বিদ্যালয়ে একটি ONU, একটি রাউটার ও অল্প কিছু তার রয়েছে। এর বাইরে অতিরিক্ত কিছু নেই। তিনি আগে একটি প্রত্যয়ন দিয়েছেন, তবে বিষয়টি পুরোপুরি বুঝতে পারেননি। কোম্পানির লোক তাকে জানিয়েছিল, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে এবং তিনি বিষয়টি বুঝিয়ে দেবেন। তবে কোনো পক্ষই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে না বলায় ইন্টারনেট সংযোগের বিষয়টি তিনি সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারছেন না বলে জানান।

ইডিসি প্রকল্পের ত্রিপক্ষীয় চুক্তিপত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোটালীপাড়া উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি নতুন যোগদান করেছেন এবং আগের বিষয়গুলো জানেন না। তবে বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তার কাছেও একাধিক অভিযোগ আসছে বলে জানান তিনি। তার আগে এ পদে থাকা শান্তানু দত্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবেন বলেও উল্লেখ করেন।

এদিকে কোটালীপাড়া উপজেলার ৬ নম্বর ঘাঘরকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা তপতী বাড়ৈকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ডেপুটেশনে বদলি করার অভিযোগও রয়েছে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শেখর রঞ্জন ভক্তের বিরুদ্ধে।

এ ঘটনার প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষিকা তপতী বাড়ৈ বাদী হয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শেখর রঞ্জন ভক্তের বিরুদ্ধে গোপালগঞ্জ সিনিয়র সিভিল জজ আদালতে ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি সিআর ২৩/২৬ নম্বর মামলা দায়ের করেন। মামলাটি বর্তমানে চলমান রয়েছে।

এদিকে কোটালীপাড়ার সচেতন মহলের অভিযোগ, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির পেছনে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোছা. জ্যোৎস্না খাতুনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা রয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে সরাসরি এমন কোনো অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হয়নি।

অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

প্রতিবেদক: মোঃ আলিমুজ্জামান, গোপালগঞ্জ।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...