ছবি : সংগৃহীত।
বিজ্ঞাপন
আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে সাশ্রয়ী আবাসন, উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো। নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন তরুণরা সরকারের কাছে আরও কার্যকর সহায়তা ও জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ দাবি করছেন।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন ইস্যুতে এসব আন্দোলন শুরু হয়েছে। স্পেনে মারিকারমেন আবাস্কাল নামে ৮৭ বছর বয়সী এক নারীকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন তরুণ-তরুণীরা। ফ্রান্সে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। অন্যদিকে, আলবেনিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে।
অনেক তরুণ-তরুণীর মতে, তাদের বাবা-মায়ের প্রজন্মের তুলনায় বর্তমানে বাড়ি কেনা বা ভাড়া নেওয়া, মানসম্মত শিক্ষা অর্জন এবং স্থিতিশীল চাকরি পাওয়া অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে পরিবর্তনশীল শ্রমবাজার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়েও তাদের উদ্বেগ বাড়ছে।
ফ্রান্সের প্রধান ছাত্র সংগঠন ‘ইউএনইএফ’-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালিস ডি ব্রিটো মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, “আমি এখানে পার্থক্যের চেয়ে মিলই বেশি দেখছি। আমরা সবাই শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সামগ্রিকভাবে তরুণ প্রজন্মের জন্য বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলছি। একই সঙ্গে আমরা জীবনযাত্রার ব্যয় এবং আবাসন সমস্যা নিয়েও আলোচনা করছি।”
বেলজিয়ামভিত্তিক দৈনিক ‘ইউরোপিয়ান করেসপন্ডেন্ট’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক জুলিয়াস ফিনটেলম্যানের মতে, এসব প্রতিবাদ তরুণদের মধ্যে সরকার নিয়ে জমে থাকা হতাশার বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেন, “তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এমন একটি অনুভূতি তৈরি হয়েছে যে, ইউরোপের রাজনীতি পরবর্তী প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।”
ফ্রান্সে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষকের ঘাটতি নিরসন এবং স্কুলের অবকাঠামো উন্নয়নের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নতুন নয়। গত নয় বছর ধরেই তারা এসব বিষয়ে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। শিক্ষার্থী নেতা অ্যালিস ডি ব্রিটো সিএনএনকে বলেন, “মানুষ উত্তরের অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।”
ইতালির রাজধানী রোমেও আবাসন সংকট শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবাসন ব্যয়ের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। রোমের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এলিসা পাস্তোরে সিএনএনকে বলেন, তিনি ও তাঁর ভাই মিলে যে কক্ষে থাকেন, সেটির ভাড়া জোগাড় করতেই তাঁদের হিমশিম খেতে হয়।
একই সংকট নিয়ে পর্তুগালেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটির রাজধানী লিসবনে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসনের দাবি জানিয়েছেন।
ইতালি ও গ্রিসের শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকরাও উন্নত বিদ্যালয়, সবার জন্য বিনামূল্যে সরকারি শিক্ষা এবং জনসেবামূলক খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন করছেন। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের অনেকে স্লোগান দিয়েছেন, “গ্রিস থেকে ফ্রান্স—আমরা চাই সবার জন্য উন্মুক্ত ও বিনামূল্যে শিক্ষা।”
আলবেনিয়ায় গত সপ্তাহে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। তবে প্রধানমন্ত্রী এদি রামা পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করে এই অস্থিরতার জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দায়ী করেন। আন্দোলনে অংশ নেওয়া এক বিক্ষোভকারী রয়টার্সকে বলেন, “আমরা পরিবর্তন চাই, আর সে কারণেই আমরা এখানে এসেছি।” তিনি আরও বলেন, “আমরা বিপ্লব চাই, আমরা নতুন সরকার চাই। আমরা কোনো আলোচনার পথে যেতে চাই না; আমাদের যত দ্রুত সম্ভব একটি নতুন সরকার প্রয়োজন।”
এদিকে, ইউরোপের অন্যান্য দেশেও নতুন কর্মসূচি সামনে আসছে। জার্মানিতে ‘জেন জেড রেগেল্ট’ নামে একটি গোষ্ঠী, যার অর্থ ‘জেন-জি সব সামলে নেবে’, আগামী ৩১ অক্টোবর দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। স্পেনের ট্রেড ইউনিয়নগুলো ১১ নভেম্বর সাধারণ ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে, ব্রিটেন ও ইতালির ছাত্র সংগঠনগুলো শিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে আগামী ২০ নভেম্বর কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা করছে।
সব মিলিয়ে ইউরোপজুড়ে জেন-জির আন্দোলন শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু দাবি-দাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং আবাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে তরুণ প্রজন্মের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের প্রতিফলন হয়ে উঠেছে। তরুণদের প্রত্যাশা পূরণে সরকারগুলো কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।
সূত্র : সিএনএন, এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...