Logo Logo

জামালগঞ্জে সচেতনতামূলক সভায় হট্টগোল, ‘ডেভিল চেয়ারম্যান’ মন্তব্যে তীব্র প্রতিবাদ


Splash Image

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিঃ সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে মাদক, জুয়া, ইভটিজিং, বাল্যবিবাহ ও খাদ্যে ভেজালবিরোধী সচেতনতামূলক সভায় হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে।


বিজ্ঞাপন


সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের নিয়ে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুম মাহমুদ তালুকদারের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এ উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। তাঁর বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে দুই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রতিবাদ জানালে সভাস্থলে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে উপস্থিত ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হলে সভার কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলা শিল্পকলা একাডেমিতে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে এ সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিল্পী রাণী মোদক। সভায় উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি এবং ৫৫টি পূজামণ্ডপের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকেরা উপস্থিত ছিলেন।

সভাটির উদ্দেশ্য ছিল মাদক, জুয়া, ইভটিজিং, বাল্যবিবাহ ও খাদ্যে ভেজালের মতো সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং শারদীয় দুর্গাপূজাসহ এলাকার বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা। তবে সভার শুরুতেই বসার ব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ দেখা দেয়। পরে বক্তব্যের একপর্যায়ে রাজনৈতিক পরিচয় ও জনপ্রতিনিধিদের মর্যাদা নিয়ে মন্তব্যের জেরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

সভা শুরুর দিকে মঞ্চে বিএনপির নেতৃবৃন্দ ও সরকারি কর্মকর্তারা বসে থাকায় উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের বসার স্থান নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। একপর্যায়ে কয়েকজন চেয়ারম্যান সভাস্থল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিল্পী রাণী মোদকের নজরে এলে তিনি মধ্যস্থতা করেন। পরে মঞ্চে থাকা অধিকাংশ ব্যক্তিকে নিচে নামিয়ে সামনের সারিতে বসার ব্যবস্থা করা হয়। মঞ্চে রাখা হয় জামালগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বন্দে আলী, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফাইজুর রহমান (ফয়েজ) এবং উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলহাজ মো. শফিকুর রহমানকে।

বসার স্থান নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার সমাধানের পর সভার কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে চলছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় চেয়ারম্যানদের নিয়ে করা একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ‘ডেভিল চেয়ারম্যান’ মন্তব্যে ক্ষুব্ধ জন প্রতিনিধিরা।

সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুম মাহমুদ তালুকদার তাঁর পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তাঁর দাদা, বাবা ও ছোট ভাই একাধিকবার উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নিজেও উচ্চশিক্ষিত বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘অনেক ডেভিল চেয়ারম্যানকে যখন মঞ্চে বসে থাকতে দেখি, তখন দুঃখ হয়।’

তাঁর এ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সভায় উপস্থিত জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। সাচনা বাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুক মিয়া এবং ভীমখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আক্তারুজ্জামান তালুকদার তাৎক্ষণিকভাবে এর প্রতিবাদ জানান।

প্রতিবাদ জানিয়ে তাঁরা বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে তাঁরা সভায় অংশ নিতে এসেছেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁদেরও যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে। তাঁদের বংশমর্যাদা নিয়েও কোনো ধরনের অবমূল্যায়ন গ্রহণযোগ্য নয় বলে তাঁরা মন্তব্য করেন।

এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে কথাকাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে সভাস্থলে হট্টগোলের সৃষ্টি হয় এবং উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

এ সময় সভায় উপস্থিত উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শাহ মো. শাহজাহান চেয়ারম্যানদের পক্ষে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, চেয়ারম্যানরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সভায় অংশ নিতে এসেছেন। তাঁদের সম্মান ও মর্যাদার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।

তবে বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি মাসুম মাহমুদ তালুকদারের দাদা ও বাবাকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন বলে জানা গেছে। এতে সভায় উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে সভার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

উপস্থিত ব্যক্তিরা উভয় পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। পরে তাঁদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর সভার কার্যক্রম আবার শুরু হয়।

সভাপতির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিল্পী রাণী মোদক সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন এবং সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন। তবে সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়োজনে জনপ্রতিনিধিদের বসার স্থান এবং বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ায় সভার মূল উদ্দেশ্য কিছুটা আড়ালে চলে যায়।

সভায় হট্টগোলের ঘটনা ঘটলেও শারদীয় দুর্গাপূজা সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে আয়োজনের স্বীকৃতি হিসেবে উপজেলার তিনটি পূজামণ্ডপকে পুরস্কৃত করা হয়।

প্রথম স্থান অর্জন করে সাচনা বাজারের জগন্নাথ জিউর মন্দির। মন্দির কর্তৃপক্ষকে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়।

দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের কদমতলীর পূজামণ্ডপ। এ মণ্ডপকে ৫ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়।

তৃতীয় স্থান অর্জন করে ফেনারবাক ইউনিয়নের বিনাজুড়া দুর্গাপূজা মণ্ডপ। এ মণ্ডপকে ৩ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়।

দুর্গাপূজা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট মণ্ডপগুলোর ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবেই এ পুরস্কার দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতেও পূজামণ্ডপগুলোর মধ্যে সুশৃঙ্খল আয়োজন, নিরাপত্তা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার ক্ষেত্রে উৎসাহ সৃষ্টি হবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করেন।

সভায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পীযূষ কান্তি মজুমদার, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ছাব্বির সারোয়ার, উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা মো. খালেদ আহমদ, উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আব্দুর রব, ফেনারবাক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল চন্দ্র তালুকদার, জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কামাল হোসেন এবং জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হানিফ মিয়া উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আজিজুর রহমান ও আজাদ হোসেন বাবলু, উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সমরেন্দ্র আচার্য সম্ভু, সাধারণ সম্পাদক অজিত কুমার রায় এবং উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক পীযূষ কান্তি তালুকদারসহ উপজেলার ৫৫টি পূজামণ্ডপের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকেরা সভায় অংশ নেন।

মাদক, জুয়া, ইভটিজিং, বাল্যবিবাহ ও খাদ্যে ভেজালের মতো সামাজিক ব্যাধি প্রতিরোধে আয়োজিত এ সভায় সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিদের পারস্পরিক সম্মান ও সৌহার্দ্য বজায় রাখার গুরুত্বও নতুন করে আলোচনায় আসে। সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও জনপ্রতিনিধিদের সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও সভার শুরুতে বসার স্থান এবং পরে বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধ অনুষ্ঠানটির আলোচনায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...