Logo Logo

বীরগঞ্জে মাদকের ভয়াল থাবা, নীরবে বদলে যাচ্ছে সমাজের চিত্র


Splash Image

একসময় সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের চায়ের দোকানে জমে উঠত আড্ডা, মাঠে খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকত কিশোর-তরুণরা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিরচেনা গ্রামীণ চিত্র বদলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের ভাষ্য, মাদকের সহজলভ্যতা ও বিস্তারের কারণে অনেক তরুণ বিপথে পা বাড়াচ্ছে। এর ফলে পরিবারে অশান্তি, শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় অনাগ্রহ, চুরি, ছিনতাই, মারামারি এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিকরা।


বিজ্ঞাপন


উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠা ক্রমেই বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গোলাপগঞ্জ, পলাশবাড়ী, শিবরামপুর, মুরারিপুর বাজার, দলুয়া, কৈকুরী, প্রেম বাজার, নতুন হাট, আওলাখুরী, চিলকুড়া, হারিয়াডাঙ্গা, মাহাতাবপুর আদর্শগ্রাম, বীরগঞ্জ কলেজ মোড়, হাটখোলা শালবাগান, বেলতলী বুড়ির হাট, কাটগড়, ১৪ হাত কালি বাজার ও ডাঙ্গার হাটসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে মাদক কেনাবেচা চলছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে দু-একজন মাদক কারবারি বা সেবনকারী আটক হলেও ব্যবসার মূল হোতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন বলে তাদের ধারণা। ফলে একজন আটক হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই অন্য কেউ সেই স্থান দখল করে নিচ্ছে। এতে মাদক ব্যবসার চক্র পুরোপুরি ভাঙা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন তারা।

স্থানীয়দের মতে, মাদক শুধু একজন ব্যক্তির নয়, একটি পুরো পরিবারের জন্য অভিশাপ। একজন মাদকাসক্ত সন্তানের কারণে বাবা-মায়ের স্বপ্ন ভেঙে যায়, স্ত্রী-সন্তান অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে এবং পরিবারে নেমে আসে অশান্তি। অনেক পরিবার সন্তানের চিকিৎসার জন্য জমি বিক্রি কিংবা ঋণ করতেও বাধ্য হচ্ছে।

গোলাপগঞ্জের চিলকুড়া গ্রামের এক অভিভাবক, যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, জানান—ছেলেকে সুস্থ করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তাকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “একসময় আমাদের পরিবারে অনেক সুখ ছিল। এখন সেই আনন্দ নেই। আমরা চাই প্রশাসন আরও কঠোরভাবে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক।”

কাটগড় দাখিল মাদ্রাসার সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট মাওলানা শহিদুল ইসলাম খোকন বলেন, “মাদকের প্রভাবে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসছে না। কেউ লেখাপড়া ছেড়ে দিচ্ছে, আবার কেউ অপরাধচক্রে জড়িয়ে পড়ছে। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি।”

সচেতন মহলের মতে, মাদকের বিস্তার অব্যাহত থাকলে সামাজিক অবক্ষয় আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নয়, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা এবং সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক স্থানে সচেতন যুবক ও বয়োজ্যেষ্ঠরা নিজ উদ্যোগে মাদক নির্মূল কমিটি গঠন করে কাজ করছেন। তাদের দাবি, মাদকসংক্রান্ত কোনো তথ্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও থানা পুলিশকে জানালে তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেন। তবে অনেকেই জানান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা এখনও তুলনামূলক কম।

স্থানীয়রা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও কার্যকর অভিযান পরিচালনা, মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা এবং যুবসমাজকে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করতে প্রশাসনের আরও জোরালো পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে বীরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান একটি নিয়মিত কার্যক্রম। সমাজের সচেতন মানুষও এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা করছেন। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে।”

তিনি জানান, শুক্রবার (২৬ জুন) সহকারী কমিশনার (ভূমি) পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতে মদনসাকো গ্রামের মো. রেজওয়ানুল ইসলাম রুবেল (৩২)-কে মাদক মামলায় ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ১০০ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পরে তাকে পুলিশি নিরাপত্তায় দিনাজপুর জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

ওসি আরও বলেন, জনস্বার্থে মাদকের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকবে।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...