বিজ্ঞাপন
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নেত্রকোণা আধুনিক সদর হাসপাতালের পুরোনো কোয়ার্টারকে অস্থায়ী ক্যাম্পাস হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। শুরুতে দ্রুত স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের আশ্বাস দেওয়া হলেও দীর্ঘ সময়েও সে উদ্যোগের দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। ইতোমধ্যে কলেজটির প্রথম ব্যাচ চিকিৎসাশিক্ষা সম্পন্ন করে বেরিয়ে গেলেও তারা নিজেদের মেডিকেল কলেজের স্থায়ী ক্যাম্পাসের মুখ দেখতে পারেনি।
নিজস্ব ক্যাম্পাস না থাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। আধুনিক অডিটোরিয়াম, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, মানসম্মত ক্যাফেটেরিয়া এবং পর্যাপ্ত আবাসিক হলের অভাবে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে অবস্থান করায় নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তুলিফ মাহমুদ বলেন, “অনেক স্বপ্ন নিয়ে এখানে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকায় প্রয়োজনীয় অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। উন্নত লাইব্রেরি, অডিটোরিয়াম ও আবাসিক হলের অভাবে শিক্ষাজীবন কঠিন হয়ে উঠেছে।”
আরেক শিক্ষার্থী সাদমান সাইফুল্লাহ নাফি বলেন, “আট বছরেও স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কোনো অগ্রগতি হয়নি। সরকার দ্রুত ভূমি নির্ধারণ করে নির্মাণকাজ শুরু করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
এক নারী শিক্ষার্থী বলেন, “নিজস্ব ছাত্রীনিবাস না থাকায় বাইরে থেকে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।”
শিক্ষকরাও বলছেন, অস্থায়ী অবকাঠামোয় একটি আধুনিক মেডিকেল কলেজের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও তারা সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
এনাটমি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুনতাসির আহমেদ বলেন, “অস্থায়ী ক্যাম্পাসের কারণে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজের সব সুবিধা এখানে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তারপরও আমরা শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ মানের শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছি।”
জানা গেছে, কলেজটির স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের জন্য দুটি সম্ভাব্য স্থানের আলোচনা রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪৯৮ একর জমির মধ্যে অব্যবহৃত প্রায় ৪০ একর ভূমি এবং অন্যটি সদর উপজেলার বালি মৌজায়। তবে এখন পর্যন্ত কোনো স্থানই চূড়ান্ত হয়নি।
কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. মুহাম্মদ সাইফুল হাসান বলেন, “প্রস্তাবিত দুটি জায়গার কোনোটিই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ভূমি নির্ধারণ বিষয়ে সরকারিভাবে আমাদের কিছু জানানো হয়নি। দ্রুত জমি নির্ধারণ করে একটি আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাস নির্মাণ করা সময়ের দাবি।”
অবকাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি শিক্ষক সংকটও কলেজটির অন্যতম বড় সমস্যা। বর্তমানে ৩৩৩ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৪০ জন। সার্জারি, চক্ষু ও নিউরোমেডিসিনসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই; কোনো কোনো বিভাগে শিক্ষকই নেই। ফলে পাঠদান ও ক্লিনিক্যাল শিক্ষায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
এদিকে স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের দাবিতে বুধবার দুপুরে নেত্রকোণা নাগরিক অধিকার কমিটির উদ্যোগে শহরের প্রেসক্লাব সড়কে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী, জনউদ্যোগ ফেলো শ্যামলেন্দু পাল, নেত্রকোণা প্রেসক্লাবের সম্পাদক মাহাবুবুল কিবরিয়া চৌধুরী (হেলিম), নাগরিক অধিকার কমিটির সদস্য সচিব নাজমুশ শাহদাত এবং সভাপতি এবিএম আব্দুল হাদি ফরাজী বক্তব্য রাখেন।
বক্তারা বলেন, আট বছরেও স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা মানসম্মত পরিবেশে চিকিৎসাশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। জেলা সদর হাসপাতালের পুরোনো কোয়ার্টারে মেডিকেল কলেজ পরিচালনা দীর্ঘমেয়াদে কোনোভাবেই কার্যকর সমাধান হতে পারে না। দ্রুত স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে কলেজটিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার দাবি জানান তারা।
সচেতন নাগরিকদের মতে, একটি মেডিকেল কলেজ শুধু চিকিৎসক তৈরির প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি জেলার স্বাস্থ্যসেবা, গবেষণা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। তাই দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত ভূমি অধিগ্রহণ, স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের মাধ্যমে নেত্রকোণা মেডিকেল কলেজকে একটি আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...