ছবি- আমির হোসেন আমুর সাথে যুবলীগ নেতা জাকির হোসেন শামীম (সাদা শার্ট) ও আদালতে দেয়া এফিডেভিট।
বিজ্ঞাপন
পুলিশের প্রতিবেদনে শামীমকে যুবলীগের নেতা এবং সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর ক্যাডার হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, বিএনপি নেতারা আদালতে দাখিল করা হলফনামায় দাবি করেছেন, তিনি স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী এবং মামলার ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
গত বুধবার (১ জুলাই) ঝালকাঠি জেলা ও দায়রা জজ আদালতে শামীমের জামিন শুনানিকালে বিষয়টি জানাজানি হয়। জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. মতিয়ার রহমান তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে জামিন শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী ও অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান মুবিনকে ভর্ৎসনা করেন। এ সময় জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহাদাৎ হোসেন আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মাহেব হোসেন জামিন শুনানির সময় হলফনামা দাখিল এবং একজন আইনজীবীকে ভর্ৎসনার বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ঘটনাটি আদালতপাড়া ও শহরজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ জুন ঝালকাঠি থানা পুলিশ বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের হওয়া জিআর-২০৫/২৪ (ঝাল) মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে যুবলীগ নেতা জাকির হোসেন শামীমকে গ্রেপ্তার করে।
মামলার বাদী পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব সুমন মণ্ডল। গত ২০২২ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি জেলা বিএনপি কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় ১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলায় জেলা যুবলীগ আহবায়ক রেজাউল করিম জাকির, যুগ্নআহবায়ক কামাল শরীফ, জেলা আওয়ামী লীগ নেতা তরুন কর্মকার, থানা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক হাফিজ আল মাহমুদসহ ১৪৬জনকে আসামী করা হয়। এ মামলায় আটক যুবলীগ নেতা জাকির হোসেন শামীম বিএনপি নেতা এপিপি মিজানুর রহমান মুবিনের ভগ্নিপতি।
যুবলীগ নেতাকে নির্দোষ এবং বিএনপি পরিবারের সদস্য দাবি করে যারা হলফনামা (নং-৭৩০/২৬, নোটারি পাবলিক: অ্যাডভোকেট মোবাশ্বের আলী ভূঁইয়া) প্রদান করেছেন, তারা হলেন— ঝালকাঠি সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এস এম এজাজ হাসান, সাধারণ সম্পাদক শওকত হোসেন খোকন, সহসভাপতি আনিচুজ্জামান চপল, সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ জিয়াউল ইসলাম, সৈয়দ রেজাউল করিম, শহর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট নাসিমুল হাসান, জেলা বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান মুবিন, অ্যাডভোকেট মু. শামীম আলম, অ্যাডভোকেট আল আমিন, জেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক সরদার সাফায়াত হোসেন, তাঁতীদলের সভাপতি মো. বাচ্চু হাসান, যুবদল নেতা সেলিম হাসান, মো. সাজিব হোসেন, রুবেল ফকির, মো. নাজমুল মিরাজ, হেমায়েত হোসেন মল্লিক, ফারজানা ইয়াসমিন, মো. তৌহিদ হোসেন, ইয়াসির আরাফাত মিঠু ও লাভলী বেগম।
হলফনামায় স্বাক্ষরকারী নেতারা হলফ করে ঘোষণা করেন, তারা সবাই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের উপজেলা ও পৌর শাখার শীর্ষ পর্যায়ের নেতা। পাশাপাশি তারা ঝালকাঠি থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের হওয়া জিআর-২০৫/২৪ (ঝাল) মামলার সাক্ষী।
হলফনামায় উল্লেখ করা হয়, গণপূর্ত অফিসের সামনে জেলা বিএনপি কার্যালয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখে সংঘটিত হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগে ১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে ছাত্রদল নেতা সুমন মণ্ডল বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক রেজাউল করিম জাকির, যুগ্ম আহ্বায়ক কামাল শরীফ, জেলা আওয়ামী লীগ নেতা তরুণ কর্মকার, থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাফিজ আল মাহমুদসহ ১৪৬ জনকে আসামি করা হয়।
হলফনামায় আরও দাবি করা হয়, জাকির হোসেন শামীম (পিতা: সুলতান হোসেন খান) ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। তিনি সিটি পার্ক রোডের স্থায়ী বাসিন্দা এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুলতান হোসেন খানের বড় ছেলে। তার ছোট ভাই শাহীন খান পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক, মা খাদিজা বেগম পৌর মহিলা দলের সাবেক সভাপতি এবং শামীম বর্তমানে পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী ও সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। বর্তমানে তিনি শাহী ৯৯ কোম্পানির সহকারী ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
হলফনামায় সাক্ষীরা আরও দাবি করেন, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখ সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত জেলা বিএনপি কার্যালয়ে সংঘটিত হামলার ঘটনায় জাকির হোসেন শামীমকে ঘটনাস্থলে বা আশপাশে তারা কেউ দেখেননি। কেউ তাকে দেখার তথ্যও তাদের দেননি। সিসিটিভি ফুটেজেও তাকে দেখা যায়নি। বাদীকে তার নাম সরবরাহ করা হয়নি এবং বাদীও এজাহারে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করেননি।
তারা আরও উল্লেখ করেন, যদি শামীমের ন্যূনতম সম্পৃক্ততাও থাকত, তাহলে সাক্ষীরা তার নাম-পরিচয় বাদীকে জানাতেন এবং তিনি এজাহারভুক্ত আসামি হতেন। এছাড়া তদন্তকারী কর্মকর্তা অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আগে কোনো সাক্ষী বা বাদীর সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা জিজ্ঞাসাবাদ করেননি বলেও হলফনামায় দাবি করা হয়েছে।
হলফনামার শেষাংশে স্বাক্ষরকারীরা বলেন, জাকির হোসেন শামীম মামলার ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তাই তাকে অহেতুক হয়রানি না করার স্বার্থে তারা স্বেচ্ছায়, স্বজ্ঞানে এবং সাক্ষী হিসেবে এই হলফনামা সম্পাদন করেছেন।
এ বিষয়ে ঝালকাঠি সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এস এম এজাজ হাসান ও পৌর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট নাসিমুল হাসান বলেন, “আমরা মামলার সাক্ষী হিসেবে একজন নির্দোষ ব্যক্তির বিষয়ে এফিডেভিট দিয়েছি।”
এবিষয়ে মামলার বাদী ও পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব সুমন মণ্ডল বলেন, “জাকির হোসেন শামীম আমার মামলার এজাহারভুক্ত আসামি নন। তাকে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুনেছি, তিনি অনেক আগে একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে তাকে আওয়ামী লীগের মিছিল-মিটিং ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে দেখা গেছে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতার সঙ্গেও তার ছবি রয়েছে। যদিও তিনি আওয়ামী লীগের কোনো কমিটির সদস্য ছিলেন না, তবুও দলটির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।”
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...