অভিযুক্ত ইউনিয়ন সমাজকর্মী পবিত্র বিশ্বাস ও নিপু আক্তার।
বিজ্ঞাপন
সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী প্রকল্পের আওতায় অসহায়, দরিদ্র, বিধবা, প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের আর্থিক সহায়তার লক্ষ্যে এ ভাতা প্রদান করা হয়। তবে গোপালগঞ্জ সদরের সাতপাড়, করপাড়া ও জালালাবাদ ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় সরকারি বিধিমালা তোয়াক্কা না করে অনিয়মের মাধ্যমে অসচ্ছলদের প্রাপ্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
গতকাল রোববার (২৩ আগস্ট) সাতপাড় ও করপাড়া ইউনিয়নে সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে এসব অনিয়মের সত্যতা মেলে।
সমাজসেবা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাতপাড় ইউনিয়নে বর্তমানে ৬১৮ জন প্রতিবন্ধী, ৩৯২ জন বিধবা ও ১,১৮৩ জন বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন। এ ইউনিয়নে বিধবা ভাতা নির্বাচনে নিয়ম কিছুটা মানা হলেও প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক ভাতা বিতরণে চরম অনিয়ম হয়েছে। স্থানীয় দীননাথ গোয়াল চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী সুজিত বালা প্রতিবন্ধী না হয়েও নিয়মিত প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। এ ছাড়া ওই ইউনিয়নের সাবেক সংরক্ষিত নারী সদস্য সারতি বিশ্বাসের দুই ছেলে (সাতপাড় উত্তর পাড়ার পলটন বিশ্বাস ও ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক পল্লব বিশ্বাস) এবং এক মেয়ে প্রতিমা বিশ্বাসসহ একই পরিবারের তিনজন পাচ্ছেন প্রতিবন্ধী ভাতা।
এমনকি বর্তমানে ভারতে বসবাসকারী সাতপাড় উত্তরপাড়ার সুভাষিনী বিশ্বাস, একই গ্রামের রীনা বিশ্বাস, গ্যারেজ মিস্ত্রি সজল কান্তি বিশ্বাস, বাজার এলাকার ভবানী বিশ্বাস, যাত্রাশিল্পী সাগরিকা মন্ডল, ৪ নম্বর ওয়ার্ডের দিলীপ মণ্ডলের ছেলে রুবেল মন্ডল, ঠাকুর বিশ্বাসের ছেলে স্বপন বিশ্বাস, সন্তোষ বিশ্বাসের মেয়ে অর্পনা বিশ্বাস, মনু বিশ্বাস, সুভাষ বিশ্বাসের মেয়ে ইতি বিশ্বাস এবং স্বপন বিশ্বাসের স্ত্রী পাখি রানী বিশ্বাসের মতো ব্যক্তিরা শারীরিক সুস্থতা সত্ত্বেও তালিকাভুক্ত হয়েছেন। স্বপন বিশ্বাস ও তাঁর স্ত্রী পাখি রানী বিশ্বাস দুজনেই একসাথে প্রতিবন্ধী ভাতা নিচ্ছেন। এ ছাড়া ১ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষ্ণপদ বিশ্বাসের ছেলে বাবু বিশ্বাস, জয়দেব কীর্তনীয়ার ছেলে হিটু কীর্তনীয়া এবং আনসার-ভিডিপি সদস্য রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের নামও রয়েছে এই তালিকায়। বাস্তবে তারা প্রত্যেকেই সম্পূর্ণ সুস্থ-সবল মানুষ।
অন্যদিকে, সাতপাড় ৪ নম্বর ওয়ার্ডের অবসরপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুশীল বর এবং তাঁর স্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য সহকারী রেবা বর দুজনেই সরকারি নিয়ম ভেঙে তুলছেন বয়স্ক ভাতা। অবসরপ্রাপ্ত বা পেনশনভোগী ব্যক্তিরা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ভাতা পাবেন না—এমন স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও এক্ষেত্রে তা মানা হয়নি।
একই ধরনের অনিয়মের চিত্র মিলেছে পার্শ্ববর্তী করপাড়া ইউনিয়নেও। সম্প্রতি করপাড়ায় এক বিধবা নারীকে ভাতা করে দেওয়ার কথা বলে অর্থ দাবি করলে স্থানীয় জনরোষের মুখে পড়েন ইউনিয়ন সমাজকর্মী পবিত্র বিশ্বাস। পরবর্তীতে তিনি কোনোমতে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। উক্ত ইউনিয়নে দায়িত্ব পালনকারী সমাজকর্মী বিপুল বিশ্বাসের অধীনেও বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতা নির্বাচনে ব্যপক অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাতপাড় ইউনিয়নের এক ভাতাভোগী জানান, সংরক্ষিত মহিলা মেম্বারের মাধ্যমে ইউনিয়ন সমাজকর্মী নিপু আক্তারের যোগসাজশে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে তিনি ভাতা কার্ড পেয়েছেন। তাঁর দাবি, টাকার বিনিময়ে নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বর্তমানে এই এলাকায় প্রতিবন্ধী ভাতা প্রাপ্তদের কেবল ৩০ শতাংশ প্রকৃত প্রতিবন্ধী। অবশিষ্ট সুবিধাভোগীরা অর্থের বিনিময়ে তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। বয়স্ক ভাতা প্রদানেও ব্যাপক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে, তবে বিধবা ভাতা নির্বাচনের বিষয়টি তুলনামূলক সঠিক ছিল।
ব্যাপক অনিয়ম ও অভিযোগ সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। মাঠপর্যায়ে যথাযথ তদারকি না থাকায় এবং কর্তব্যে অবহেলার সুযোগে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী প্রকল্পের সরকারি অর্থ অন্যায়ভাবে হাতবদল হচ্ছে বলে তাঁদের মত।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত ইউনিয়ন সমাজকর্মী নিপু আক্তার ও পবিত্র বিশ্বাসের মোবাইল ফোনে এই প্রতিবেদক বারবার ফোন করলেও তাঁরা ফোন ধরেননি।
তবে অনিয়মের বিষয়ে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শারমিন আক্তার জানান, অনিয়মের কোনো লিখিত বা নির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...