বিজ্ঞাপন
শুধু একটি পরিবারের অভিযোগের নিষ্পত্তির বিষয় নয়, এমন ঘটনায় তদন্তের ফলাফল প্রকাশ না হওয়া স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে। অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা—তা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তের। কিন্তু তদন্তের ফলাফলই যদি দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে না আসে, তাহলে প্রকৃত ঘটনা জানা যেমন কঠিন হয়, তেমনি মানুষের মধ্যেও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহায় অবস্থিত সাউথ চট্টগ্রাম হাসপাতালে এক কন্যা নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসায় অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ ওঠে। একই ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নবজাতকের পরিবারের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার অভিযোগও সামনে আসে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ ধরনের লেনদেনের বিষয়ে অবগত নয় বলে জানিয়েছে।
জানা যায়, গত ২৭ আগস্ট ভোর সাড়ে ৬টার দিকে সাউথ চট্টগ্রাম হাসপাতালে এক কন্যা নবজাতকের মৃত্যু হয়। নবজাতকের বাবা মো. নাঈম এবং মা নিফা আক্তার। তাঁদের বাড়ি আনোয়ারা উপজেলায়।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ আগস্ট নিফা আক্তারকে সাউথ চট্টগ্রাম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই দিন রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে তাঁর সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর মা সুস্থ ছিলেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়। পরে ২৭ আগস্ট ভোরে নবজাতকটির মৃত্যু হয়।
পরিবারের অভিযোগ, নবজাতক অসুস্থ হওয়ার পর প্রয়োজনীয় সময়ে চিকিৎসকের সাড়া পাওয়া যায়নি। তাঁদের দাবি, চিকিৎসায় অবহেলার কারণেই নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে।
নবজাতকের বাবা মো. নাঈম বলেন, “আমরা রোগী নিয়ে হাসপাতালে গেলে ডাক্তার ঠিকমতো সাড়া দেননি। রাতে এবং সকালে ডাকলেও ডাক্তার আসেননি। তাঁদের অবহেলার কারণেই আমার সন্তান মারা গেছে।”
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এক লাখ টাকা লেনদেনের মাধ্যমে সমঝোতার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে নাঈম বলেন, “প্রায় ৮০ হাজার টাকা লেনদেন হয়েছে। চিকিৎসা ও হাসপাতালের বিল বাবদ টাকা কেটে রেখে আমার বড় ভাই ইদ্রিসকে ৪০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি এখনো ভয় পাচ্ছি। আমার স্ত্রী যেহেতু ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তাই তাঁর সঙ্গে আবার কোনো ধরনের সমস্যা হয় কি না, সে আশঙ্কায় আছি।”
তবে পরিবারের পক্ষ থেকে করা এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
সাউথ চট্টগ্রাম হাসপাতালের ম্যানেজার মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় এক লাখ টাকা লেনদেনের মাধ্যমে রফাদফা হয়েছে—এমন অভিযোগের বিষয়ে আমরা অবগত নই। এক লাখ টাকা লেনদেনের বিষয়ে আমরা কিছু জানি না। যারা লেনদেন করেছে, তারা বিষয়টি ভালো বলতে পারবে। নবজাতক মারা গেছে, এটি সত্য।”
তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে তাঁদের ডাকা হয়েছিল এবং এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ধারণা, পায়খানা করার কারণে নবজাতকটির মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলেও জানান তিনি। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার কথা।
কর্ণফুলী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোছাম্মাৎ জেবুন্নেছা বলেন, সাউথ চট্টগ্রাম হাসপাতালে নবজাতকের মৃত্যুর খবর পেয়ে বিষয়টি সিভিল সার্জনকে অবহিত করা হয়েছে। সিভিল সার্জনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। তিনি নিজেও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
তিনি বলেন, জন্মের পর থেকেই নবজাতকটির শারীরিক অবস্থা ভালো ছিল না বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে নবজাতকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
এক লাখ টাকা লেনদেনের মাধ্যমে সমঝোতার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ তাঁদের কাছে কেউ করেনি।
নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের পর এক মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো সেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে কিছুদিন আগে কর্ণফুলী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোছাম্মাৎ জেবুন্নেছার কাছে জানতে চাইলে তিনি কিছুদিন পর প্রতিবেদন দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতেও তদন্ত প্রতিবেদনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি পাওয়া যায়নি।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—তদন্তের কাজ কি এখনো শেষ হয়নি, নাকি প্রতিবেদন প্রস্তুত হলেও তা প্রকাশ করা হয়নি? আর যদি তদন্তে বিলম্ব হয়ে থাকে, তার কারণই বা কী?
গত ৩০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমানের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি কল রিসিভ করেননি।
পরে হোয়াটসঅ্যাপে তদন্ত প্রতিবেদন ও বিষয়টির অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ‘OK’ লিখে সাড়া দেন। তবে তদন্ত প্রতিবেদন কেন এখনো প্রকাশ হয়নি বা কবে প্রকাশ করা হবে—এ বিষয়ে আর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ ফজলে রাব্বির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত ছিলাম না। আপনার কাছে থাকা বিস্তারিত তথ্য ও বিষয়টি আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠান। আমি দেখব কেন তদন্ত রিপোর্ট হয়নি বা কেন দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।”
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে আরও একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—জেলা পর্যায়ে তদন্ত কমিটি গঠনের পরও বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ কেন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না?
অবশ্য এর কারণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
একটি নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে—এটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ। কিন্তু সেই তদন্তের ফলাফল দীর্ঘদিন প্রকাশ না হলে বিষয়টি শুধু অভিযোগকারী পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না।
কারণ সাধারণ মানুষ চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের ওপর আস্থা রাখেন। সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে যথাযথ তদন্ত এবং তদন্তের ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। এতে অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, আবার অভিযোগের সত্যতা না থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসকদের বিষয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নের অবসান ঘটে।
অন্যথায় একটি ঘটনার তদন্ত ঝুলে থাকলে ভুক্তভোগী পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর আস্থা ও বিশ্বাসেও প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে নবজাতকের মৃত্যুর মতো স্পর্শকাতর ঘটনায় তদন্তের ফলাফল নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এখানে কাউকে আগেই দোষী সাব্যস্ত করার প্রশ্ন নেই; বরং অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা জনসম্মুখে তুলে ধরাই মূল বিষয়।
এদিকে, সাউথ চট্টগ্রাম হাসপাতালের বিরুদ্ধে এর আগেও নবজাতকের মৃত্যু, নবজাতক বিক্রিসহ একাধিক অভিযোগ ওঠার কথা জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কী তদন্ত হয়েছে, তদন্তের ফলাফল কী এবং কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না—তার সুস্পষ্ট তথ্যও জনসম্মুখে পাওয়া যায়নি।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, কোনো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এলে সেগুলোর যথাযথ তদন্ত, নজরদারি এবং ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কতটা কার্যকর?
নবজাতকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী, চিকিৎসায় কোনো অবহেলা ছিল কি না, পরিবারের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা কতটুকু এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের সঙ্গে পরিবারের অভিযোগের পার্থক্যের কারণ কী—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত প্রতিবেদনেই স্পষ্ট হওয়ার কথা।
তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এখন মূল প্রত্যাশা—তদন্ত দ্রুত শেষ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা এবং অভিযোগের সত্যতা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও সেটি স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন। কারণ স্বচ্ছ তদন্ত ও প্রকাশ্য জবাবদিহিই পারে একটি নির্দিষ্ট ঘটনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর আস্থা ও বিশ্বাস অটুট রাখতে।
অভিযোগের সত্যতা তদন্তেই নির্ধারিত হোক—এবং তদন্তের ফলাফলও যেন আর দীর্ঘসূত্রতায় আটকে না থাকে, এখন সেটিই প্রত্যাশা।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...