Logo Logo

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় পায়ের ঘষায় উঠে যাচ্ছে কার্পেটিং


Splash Image

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায় স্থানীয় প্রকৌশলীর উপস্থিতিতে কাজ শেষ করার এক সপ্তাহ না যেতেই সড়কের কার্পেটিং পায়ের ঘষায় উঠে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার চিমনজোত মসজিদ থেকে শারিয়ালজোত বিওপি সড়কের পূর্ব শারিয়ালজোত গ্রামের একটি অংশে এ চিত্র দেখা গেছে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও নামমাত্র বিটুমিন প্রয়োগের কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।


বিজ্ঞাপন


সড়কের কার্পেটিং উঠে যাওয়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজের ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগ জানিয়েছে, সড়কটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত ২১ ও ২৭ অক্টোবর দুপুরে উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের পূর্ব শারিয়ালজোত গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে সড়কটির এমন বেহাল অবস্থা দেখা যায়।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও শিডিউল সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-৩-এর আওতায় সড়কটির নির্মাণকাজ হাতে নেওয়া হয়। ৩ নম্বর তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের চিমনজোত মসজিদ থেকে শারিয়ালজোত বিওপি পর্যন্ত সড়কের পূর্ব শারিয়ালজোত গ্রামের আব্দুল কাশেমের বাড়ি থেকে নুর ইসলাম ওরফে সুরুজ আলীর বাড়ি পর্যন্ত ৪৫০ মিটার সড়ক নির্মাণে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৪৪ লাখ ১১ হাজার ৮৬২ টাকা। চুক্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয় ৪১ লাখ ৯১ হাজার ২৬৮ টাকা।

দরপত্রের মাধ্যমে কাজটি পায় তেঁতুলিয়া উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের বুড়াবুড়ি গ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান উমর ফারুক ট্রেডার্স। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী জাকির হোসেনের স্ত্রী বেলি আক্তার। তবে কাজ পাওয়ার পর উমর ফারুক ট্রেডার্স প্রতিষ্ঠানটি রাফি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী রেজাউল ইসলামের কাছে কাজটি বিক্রি করে দেয় বলে জানা গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন ভোরে ফজরের নামাজের পর নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে সড়ক নির্মাণের কাজ করেছেন। সড়ক নির্মাণে প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন মানা হয়নি। কার্পেটিংয়ের আগে যথাযথভাবে বিটুমিন প্রয়োগ না করায় হাত দিয়ে টান দিলেই কিংবা পা দিয়ে ঘষা দিলেই পিচ উঠে যাচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, কাজ শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ না যেতেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে পায়ের ঘষায় কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও ফাটল দেখা দিয়েছে, আবার সড়কের পাশেও ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর উঠে যাওয়া কার্পেটিং মেরামতের আশ্বাস দেওয়া হলেও সরেজমিনে যাওয়ার সময় পর্যন্ত তা ঠিক করা হয়নি বলে স্থানীয়রা জানান।

স্থানীয় বাসিন্দা সূর্য বানু বলেন, “রাস্তার কাজ ভালো হয়নি, দুই নম্বর কাজ হয়েছে। যে পিচ দিয়েছে, তা ভালো হয়নি। মানুষ যখন ভোরে নামাজ পড়ে, তখন এই রাস্তার ঢালাইয়ের কাজ করেছে। সন্ধ্যার পরেও কাজ হয়েছে। আমি আগে রাস্তার কাজ করেছি, ওই সময় রাস্তার কাজ করে না।”

স্থানীয় বাসিন্দা জনাব আলী বলেন, “আমার জীবনেও এমন কাজ দেখিনি। ঢালাইয়ের আগে পানি মারে, তেল মারে—তা করেনি। তিন দিনও হয়নি, সব উঠে গেল।”

শারিয়ালজোত গ্রামের তাহমিনা বেগম, এরশাদ আলী ও সাইফুল ইসলাম জানান, কার্পেটিংয়ের আগে যেভাবে বিটুমিন ছিটানোর কথা, সেভাবে দেওয়া হয়নি। কোথাও কোথাও বিটুমিন না দিয়েই কার্পেটিং করা হয়েছে। ভোরে এসে ঠিকাদারের লোকজন কাজ করেছেন। বর্তমানে সামান্য আঘাত কিংবা পায়ের ঠেলাতেই পিচ-পাথর উঠে আসছে।

তারা এ অনিয়মের প্রতিবাদ জানিয়ে দ্রুত সড়কটি পুনরায় সংস্কার এবং এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

সড়কের কার্পেটিং উঠে যাওয়ার দৃশ্য ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর ঠিকাদারের লোকজন বিটুমিন প্রয়োগের জন্য এলেও কাজ না করেই চলে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল ও নুর হোসেন জানান, উঠে যাওয়া কার্পেটিং মেরামতের জন্য পিচ গরম করা হচ্ছিল। এ সময় একটি সাদা গাড়ি সেখানে আসে। গাড়িটি চলে যাওয়ার পর ঠিকাদারের লোকজনও কাজ ফেলে চলে যান।

এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ঠিকাদার রেজাউল ইসলাম বলেন, “রাস্তার কাজ শুরু হয়েছে ফেব্রুয়ারি মাসে। কাঁচা অবস্থায় গাড়ি ঢুকে গিয়ে ব্রেক দিচ্ছে, তাই এমনটি হচ্ছে। অন্তত ৭২ ঘণ্টা সুযোগ দেওয়া উচিত।”

উমর ফারুক ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী বেলি আক্তারের স্বামী জাকির হোসেন বলেন, তাঁর স্ত্রীর লাইসেন্সে প্রতিষ্ঠানটি কাজ পেয়েছিল। পরে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে রাফি এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান কাজটি কিনে নেয়। কাজটি বিক্রির সময় শর্ত ছিল, কোনো ধরনের অনিয়ম করা যাবে না। অনিয়ম হলে তার দায়ভার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকেই নিতে হবে।

তিনি আরও জানান, ঠিকাদারের বিল জমা দেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে কাজটি ভালোভাবে বুঝে নেওয়ার জন্য বলবেন।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. রমজান আলী বলেন, “বিষয়টি ফেসবুকে দেখেছি। ঠিকাদারকে ফাইনাল বিল দেওয়া হয়নি। ঠিকাদারের কাছ থেকে কাজটি ঠিক করে নেওয়া হবে। এ ছাড়া আমরা সরেজমিনে পরিদর্শন করে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”

উপসহকারী প্রকৌশলী ইব্রাহীম খলিল বলেন, তিনি নতুন যোগদান করেছেন। তবে যতটুকু জানেন, উঠে যাওয়া কার্পেটিংয়ে পুনরায় বিটুমিন প্রয়োগ করতে ঠিকাদার এলাকাবাসীর ভয়ে যেতে চাচ্ছেন না।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আনোয়ার হোসাইন বলেন, বিষয়টি তদন্তের জন্য তিনি প্রকৌশলীকে দায়িত্ব দিয়েছেন। প্রকৌশলী বিষয়টি দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। এরপরও ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তিনি ঠিকাদারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবেন বলে জানান।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...