বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ।
বিজ্ঞাপন
ভারতের সাপ্তাহিক ইংরেজি ম্যাগাজিন দ্য উইক-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
সাক্ষাৎকারে জামায়াতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, রাষ্ট্র পরিচালনার দৃষ্টিভঙ্গি, নির্বাচনী প্রস্তুতি, তরুণ ভোটারদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং নারী ও সংখ্যালঘুদের বিষয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
নিষেধাজ্ঞা ও নির্বাচনী প্রস্তুতি
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কর্তৃত্ববাদী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের কয়েক দিন আগে জামায়াতে ইসলামীর ওপর আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও, বাস্তবে ২০১৩ সাল থেকেই দলটিকে কার্যত নিষিদ্ধ অবস্থায় রাখা হয়েছিল। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচার বিভাগের অপব্যবহার করে দলের নিবন্ধন বাতিল এবং নির্বাচনী প্রতীক কেড়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য মতে, সেই সময়টি ছিল বাংলাদেশে নির্বাচনভিত্তিক গণতন্ত্রের অবনমনের সময়।
তিনি বলেন, নিবন্ধন বাতিল, গণগ্রেপ্তার ও দমন-পীড়নের মধ্যেও জামায়াত জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। বিশেষ করে ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে দলীয় সাফল্য সংগঠনের দৃঢ় অবস্থান ও জনসমর্থনের প্রমাণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থান ও আদালতের রায়ে নিবন্ধন এবং প্রতীক পুনর্বহালের পর সমর্থকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে দল জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি জোরদার করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তাদের ছাত্রসংগঠনের বিজয় তরুণদের সমর্থনের প্রতিফলন বলেও দাবি করেন তিনি।
নির্বাচনের বাইরে থাকার অভিজ্ঞতা
নির্বাচনী রাজনীতির বাইরে থাকার সময় থেকে কী শিক্ষা পেয়েছেন—এ প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও দল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে সরে যায়নি। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে যৌথ প্রতীকে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়লে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর ঐক্য অপরিহার্য।
তার মতে, এই সময় দলকে আরও সাংগঠনিকভাবে সুসংহত করেছে। অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা জোরদার, তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা এবং রাজনৈতিক কৌশল পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে দল বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছে।
আদর্শিক দল ও জনসমর্থন
জামায়াতকে ক্যাডারভিত্তিক মতাদর্শিক দল হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়ে তিনি বলেন, দলটি আদর্শিক হলেও সেই আদর্শের ভিত্তি শৃঙ্খলা, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও জনসেবা। তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-পীড়নের সময়ও জামায়াত অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রেখেছে।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি ও সুবিধাবাদী রাজনীতিতে মানুষের আস্থা কমেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভোটাররা এখন কথার চেয়ে নীতিনিষ্ঠ রাজনীতি ও বিশ্বাসযোগ্যতা খোঁজেন। বিভিন্ন স্বাধীন জরিপে জামায়াতের প্রতি জনসমর্থন বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দুর্নীতি ও অকার্যকর শাসনে হতাশ তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গির মিল রয়েছে। তরুণরা জীবনের উদ্দেশ্য, সততা ও সুযোগ চান—এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, জামায়াত মূল্যবোধভিত্তিক রাজনীতির বিকল্প তুলে ধরছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে এ সংযোগ ইতোমধ্যে দৃশ্যমান বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
দলের নীতিগত অগ্রাধিকার হিসেবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তা তৈরির ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেন তিনি, যাতে তরুণরা বিদেশমুখী না হয়ে দেশেই মর্যাদাপূর্ণ কর্মজীবন গড়তে পারেন। তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তরুণদের আত্মত্যাগকে দল গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে।
অতীত নিয়ে সমালোচনা ও ক্ষমা প্রার্থনা
জামায়াতের অতীত এখনো বর্তমানকে প্রভাবিত করছে—এমন সমালোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, জনগণ দলটির ইতিহাস সম্পর্কে অবগত এবং একাধিকবার ব্যালটের মাধ্যমে সমর্থন দিয়েছে। অতীতকে বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহার করে বর্তমানের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ অস্বীকার করা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে নৈতিক দায়বদ্ধতার কথা উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৪৭ সালের পর থেকে কোনো জামায়াত সদস্যের কর্মকাণ্ডে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে তিনি আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী। এটি দলের নৈতিক জবাবদিহি ও ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকারের বহিঃপ্রকাশ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
গণতন্ত্র, নারী ও সংখ্যালঘু প্রসঙ্গ
গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের প্রতি জামায়াত অঙ্গীকারবদ্ধ বলে দাবি করেন দলটির আমির। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ন্যায়বিচার, সমান নাগরিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করাই দলের দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রবিন্দু।
তিনি জানান, সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্বের অংশ হিসেবে হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। নারী প্রার্থী না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, জোটভিত্তিক আসন বণ্টনের কারণে প্রতিটি আসনে একজন করে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। জোটসঙ্গী দলগুলোর নারী প্রার্থীদের জামায়াত পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
অতীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একাধিক নারী প্রার্থী দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাংগঠনিক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। ভবিষ্যতে বৈচিত্র্যপূর্ণ জাতীয় সরকার গঠনের লক্ষ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, নারী, সংখ্যালঘু, তরুণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার নীতিগত প্রতিশ্রুতি দলের রয়েছে।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
সর্বশেষ
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...