Logo Logo

সুনামগঞ্জে বোরো ক্ষতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক

কাগজে ৮০ শতাংশ ধান কাটা, বাস্তবে হাওরে হাহাকার


Splash Image

অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে দেখা দিয়েছে তীব্র বিতর্ক। মাঠের বাস্তবতা ও সরকারি হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতির অভিযোগ তুলেছেন কৃষক, জনপ্রতিনিধি, হাওর রক্ষা আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ও সচেতন মহল। তাদের দাবি, বাস্তবে যেখানে অধিকাংশ হাওরের ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে, সেখানে কৃষি বিভাগ কাগজে-কলমে “৮০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে” দেখিয়ে প্রকৃত ক্ষতির চিত্র আড়াল করার চেষ্টা করছে।


বিজ্ঞাপন


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জ জেলায় মোট ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। এর মধ্যে গড়ে ৭২ দশমিক ৫৩ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, হাওরাঞ্চলে ৮২ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং নন-হাওর এলাকায় ৪৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ জমির ফসল কাটা সম্পন্ন হয়েছে। একইসঙ্গে জলাবদ্ধতায় ১৬ হাজার ৩৯৫ দশমিক ৭২ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্যও তুলে ধরা হয়।

তবে কৃষি বিভাগের এই তথ্য সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন হাওরপাড়ের কৃষকরা। তাদের ভাষ্য, বাস্তবে অর্ধেকেরও বেশি জমির ধান কাটা সম্ভব হয়নি। আকস্মিক বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে অধিকাংশ হাওরের ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। যেসব ধান কাটা হয়েছে, সেগুলোও রোদ না থাকায় শুকাতে না পেরে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাখিমারা হাওরের কৃষক জাবেদ আলী বলেন, “আমাদের হাওরের প্রায় ৯০ শতাংশ জমি পানির নিচে চলে গেছে। আমার নিজের ১০ কেয়ার জমির সব ধান ডুবে গেছে। সরকার যদি বাস্তবতা জানতে চায়, তাহলে সরেজমিনে এসে দেখুক।”

সদর উপজেলার শিয়ালমারা হাওরের কৃষক আব্দুল বসির বলেন, “৮ কেয়ার জমির মধ্যে মাত্র ২ কেয়ারের ধান কষ্ট করে কাটতে পেরেছি। এখন সেই ধানও শুকাতে পারছি না। সামনে আরও বড় ক্ষতির আশঙ্কা আছে।”

হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতারাও কৃষি বিভাগের তথ্যকে “ভিত্তিহীন” বলে আখ্যা দিয়েছেন। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক একে কুদরত পাশা বলেন, “৮০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে— এই দাবি সম্পূর্ণ অসত্য। এটি কৃষকদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। কলমের মাধ্যমে ধান কাটা দেখিয়ে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি আড়াল করা হচ্ছে।”

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, “রহস্যজনক কারণে প্রকৃত ক্ষতির তথ্য গোপন করা হচ্ছে। বাস্তবে জেলার অর্ধেক ধানও কাটা হয়নি। কৃষকরা ভয়াবহ ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। এখন যদি সঠিক তথ্য তুলে ধরে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করা না হয়, তাহলে সামনে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।”

এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক দাবি করেছেন, মাঠ পর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতেই ধান কাটার হিসাব প্রস্তুত করা হয়েছে। তিনি বলেন, “এপ্রিলের ৩ তারিখ থেকে ধান কাটা শুরু হয়েছে। মাঝে টানা বৃষ্টির কারণে তিনদিন কাজ বন্ধ ছিল। তারপরও প্রতিদিন ধান কাটা হয়েছে। এখানে তথ্য কম-বেশি করে আমাদের কোনো লাভ নেই।”

তিনি আরও জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে জলাবদ্ধতায় ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

গত মঙ্গলবার দুপুরে সুনামগঞ্জে হাওর পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। সভায় কৃষি বিভাগের উপপরিচালকের দেওয়া ধান কর্তন সংক্রান্ত তথ্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিরা।

সভায় জেলা বিএনপি নেতা আকবর আলী বলেন, “আমি খুবই আশ্চর্য হয়েছি কৃষি বিভাগের উপপরিচালক মহোদয়ের বক্তব্য শুনে। উনি বলেছেন ৮০ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। আমি এর সবিনয়ে বিরোধিতা করছি। বাস্তবে এত ধান কাটা হয়নি। উনি বলেছেন বাইরে থেকে শ্রমিক এনে ধান কাটা হয়েছে, কিন্তু অনেক হাওরে এখনো ধান পানির মধ্যে পড়ে আছে।”

তিনি আরও বলেন, “যে দেখার হাওরে এমপি মহোদয়, জেলা প্রশাসক ও এসপি মহোদয় গিয়ে বাঁধ কেটে পানি নামানোর ব্যবস্থা করেছিলেন, সেই হাওরের অনেক ধানও কাটার অভাবে নষ্ট হয়েছে। তাই আমি অনুরোধ করবো, প্রকৃত তথ্য যেন জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়।”

জেলা বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট শেরেনূর আলী বলেন, “ধান কর্তন শুরু হওয়ার সময় থেকেই আমরা কৃষি বিভাগের তথ্যের বিরোধিতা করেছি। শুধু আমরা নই, মাঠে কাজ করা সাংবাদিকরাও বাস্তব পরিস্থিতি দেখেছেন। ৮০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে— এই তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে যায় না। উপরমহলকে খুশি করার জন্য এমন তথ্য দেওয়া হলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হবেন।”

তিনি ঢাকা থেকে একটি বিশেষজ্ঞ সার্ভে টিম পাঠিয়ে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিরূপণের দাবি জানান।

সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলও কৃষি বিভাগের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, “আমি দেখেছি, প্রকৃত ক্ষতির চেয়ে কম দেখানোর চেষ্টা করা হয়। কেন এমন করা হয়, সেটা আমার বোধগম্য নয়। সঠিক চিত্র তুলে ধরা জরুরি। না হলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন।”

হাওরাঞ্চলের কৃষকদের অভিযোগ, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য গোপন করা হলে তারা সরকারি সহায়তা, প্রণোদনা ও পুনর্বাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। তাই দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বাস্তবভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরির দাবি জানিয়েছেন তারা।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...