বিজ্ঞাপন
দীর্ঘদিন ধরে বর্ষাকালে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, নৌযাননির্ভর চলাচল এবং যাতায়াতের দুর্ভোগে থাকা জামালগঞ্জ, ধর্মপাশাসহ বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের মানুষের জন্য এ প্রকল্পকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সড়কটি বাস্তবায়িত হলে কৃষি, মৎস্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পর্যটনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।
‘হাওর এলাকায় উড়ালসড়ক ও ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত হচ্ছে জামালগঞ্জ–ধর্মপাশা উড়াল সড়ক। পুরো প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। এর মূল সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ১০ দশমিক ৮১ কিলোমিটার অংশ উড়াল সড়ক হিসেবে নির্মাণ করা হবে।
সড়কটি জামালগঞ্জের সাচনা–কাজীরগাঁও, ধর্মপাশার জয়শ্রী, ধর্মপাশা বাজার ও আলেকদিয়া হয়ে নেত্রকোনার বারহাট্টা পর্যন্ত সংযোগ স্থাপন করবে। এর ফলে প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য এলাকার সড়ক যোগাযোগ আরও সহজ ও নিরাপদ হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বর্ষাকালে পানিতে তলিয়ে যাওয়া সড়কের কারণে যেসব এলাকায় নৌপথই প্রধান যোগাযোগমাধ্যম হয়ে ওঠে, সেখানে উড়াল সড়কটি স্থায়ী যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাওরাঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি কৃষি। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বোরো ধান উৎপাদন হলেও ফসল পরিবহন ও বাজারজাত করতে কৃষকদের নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে সড়ক পানিতে তলিয়ে গেলে পরিবহন ব্যয় ও সময় দুটোই বেড়ে যায়।
উড়াল সড়ক চালু হলে ধানসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য দ্রুত উপজেলা, জেলা ও দেশের বিভিন্ন বাজারে নেওয়া সম্ভব হবে। এতে পরিবহন ব্যয় কমার পাশাপাশি কৃষকরা সময়মতো পণ্য বাজারজাত করে ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল মৎস্যসম্পদে সমৃদ্ধ। যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় দ্রুত মাছ বাজারজাত করা সম্ভব হয় না। উড়াল সড়ক নির্মাণের পর হাওরের বিভিন্ন এলাকা থেকে মাছ দ্রুত দেশের বিভিন্ন বাজারে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হবে। এতে মৎস্য ব্যবসার প্রসার ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
একই সঙ্গে হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ঘিরে পর্যটনেও নতুন গতি আসতে পারে। বর্ষায় বিস্তীর্ণ জলরাশি, নৌপথ ও হাওরের জীবন দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা সুনামগঞ্জে আসেন। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা হলে পর্যটকদের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, নৌযান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর সাচনা বাজার উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সুনামগঞ্জ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) আয়োজিত জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিল্পী রানী মোদকের সভাপতিত্বে সভাটি সঞ্চালনা করেন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আজিজুর রহমান।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল। বিশেষ অতিথি ছিলেন উড়াল সড়ক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ফেরদৌস আহমদ, সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন, কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সহসাধারণ সম্পাদক আনিসুল হক এবং ধর্মপাশা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আব্দুল মুতালিব খান।
জনসভায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন, জামালগঞ্জ–ধর্মপাশা উড়াল সড়ক শুধু একটি যোগাযোগ প্রকল্প নয়; এটি দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে হাওরবাসীর মুক্তির প্রত্যাশার প্রতিফলন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষের চলাচল সহজ হবে এবং পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যথাযথ মান বজায় রেখে প্রকল্পের কাজ শেষ হলে এটি সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠবে। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত সেই উন্নয়নযাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...