Logo Logo

পর্দার আড়ালের নায়ক : রক্তদাতা সংগঠনগুলোর রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন সময়ের দাবি


Splash Image

চিকিৎসকদের সেবা কিংবা বাহিনীর দেশরক্ষার মতোই অনস্বীকার্য রক্তদাতাদের জীবন বাঁচানোর সংগ্রাম। একটি দেশের স্বাস্থ্যখাত এবং মানবিক কাঠামোর অন্যতম মজবুত ভিত্তি হলেন রক্তদাতারা। প্রতিদিন হাজারো অসহায় মানুষ যখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে একটু রক্তের জন্য হাহাকার করেন, তখন কোনো ধরনের রক্তসম্পর্ক বা চেনা-পরিচয় ছাড়াই পাশে এসে দাঁড়ান একদল তরুণ-তরুণী। নিজের শরীরের মূল্যবান রক্ত দিয়ে তারা নিভে যাওয়া জীবন প্রদীপকে আবার জ্বালিয়ে তোলেন।


বিজ্ঞাপন


বাংলাদেশে স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা সংগঠনগুলো যেভাবে নীরবে-নিভৃতে সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচাতে বিশাল অবদান রেখে চলেছে, তা এক কথায় অনন্য। অথচ, অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, এই মানবিক যোদ্ধাদের অবদান আজো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বা রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ মূল্যায়ন পায় না।

ইসলাম ধর্মসহ প্রতিটি ধর্মেই মানবসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমাদের দেশের রক্তদাতা স্বেচ্ছাসেবকরা কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা, পদক কিংবা আর্থিক লাভের আশায় এই কাজ করেন না। তারা সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে, কেবল সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি এবং মানবিক তাড়না থেকে এই মহৎ ব্রত পালন করে আসছেন। গভীর রাতেও যখন কোনো মুমূর্ষু রোগীর স্বজনরা রক্তের খোঁজে দিশেহারা হয়ে পড়েন, তখন এই তরুণরাই ঘুম বিসর্জন দিয়ে রক্ত দিতে ছুটে যান। নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে তারা সংগঠনের কাজ পরিচালনা করেন। তাদের এই ত্যাগের কোনো পার্থিব মূল্য হয় না।

একটি সুস্থ ও সচল রাষ্ট্র গঠনে বিভিন্ন পেশা ও বাহিনীর অবদান আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। চিকিৎসকরা রাত-দিন রোগীদের সেবা দিচ্ছেন, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আমাদের সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে জীবন বাজি রেখে কাজ করছে। রাষ্ট্র তাদের এই অবদানকে সম্মান জানায়, পুরস্কৃত করে এবং তাদের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করে। ঠিক একইভাবে, রক্তদাতা সংগঠনগুলোও কিন্তু পরোক্ষভাবে দেশের নাগরিকদের মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করার এক নীরব যুদ্ধে নিয়োজিত রয়েছে। যদি এই সংগঠনগুলো সময়মতো রক্তের জোগান দিতে না পারত, তবে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ত এবং প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ অকালে প্রাণ হারাত। তাই তাদের কাজকে দেশরক্ষা বা জনসেবার চেয়ে কোনো অংশে কম ভাবার সুযোগ নেই।

দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের সমাজে এখনো রক্তদাতাদের এবং রক্তদাতা সংগঠনগুলোকে উপযুক্ত মর্যাদা দেওয়া হয় না। অনেক সময় দেখা যায়, হাসপাতালে রক্ত দিতে গিয়েও স্বেচ্ছাসেবকদের নানা ধরনের হয়রানি বা অবহেলার শিকার হতে হয়। সরকারি বা বেসরকারি কোনো স্তরেই এই সংগঠনগুলোর জন্য বিশেষ কোনো পৃষ্ঠপোষকতা বা নীতিমালার ব্যবস্থা নেই।

এখন সময় এসেছে এই মানসিকতা পরিবর্তনের। রক্তদাতা সংগঠনগুলোকে শুধু "স্বেচ্ছাসেবী" তকমা দিয়ে পর্দার আড়ালে ফেলে রাখা অন্যায়। তাদের যথাযথ সম্মান ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:

• জাতীয় স্বীকৃতি ও পুরস্কার: প্রতি বছর জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ রক্তদাতা সংগঠন ও দীর্ঘমেয়াদী রক্তদাতাদের রাষ্ট্রীয় পদক বা সম্মাননা প্রদান করা উচিত।

• হাসপাতালে অগ্রাধিকার ও সম্মান: সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে রক্তদাতাদের জন্য বিশেষ হেল্পডেস্ক স্থাপন এবং রক্তদান করতে আসা স্বেচ্ছাসেবকদের যথাযথ সম্মান ও অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

• আইডি কার্ড ও নাগরিক সুবিধা: নিয়মিত রক্তদাতাদের জন্য বিশেষ ‘রক্তদাতা পরিচয়পত্র’ (Blood Donor ID) চালু করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে তারা সরকারি সেবা, পরিবহন বা চিকিৎসার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু সুযোগ-সুবিধা পাবেন।

• প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা: রক্তদাতা সংগঠনগুলোর ডাটাবেজ তৈরি, ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্পেইন এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে অনুদানের ব্যবস্থা করা উচিত।

স্বেচ্ছাসেবকরা প্রতিদানের আশায় রক্ত দেন না, কিন্তু একটি কৃতজ্ঞ জাতি হিসেবে তাদের মূল্যায়ন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। রক্তদাতা সংগঠনগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি ও সম্মান দিলে তরুণ সমাজ মানবিক কাজে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি মানবিক ও সুশৃঙ্খল রাষ্ট্র গঠনে সহায়তা করবে। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং রাষ্ট্র এই নিঃস্বার্থ জীবনদাতাদের অবদানের গুরুত্ব অনুধাবন করবেন এবং তাদের যোগ্য মর্যাদায় ভূষিত করবেন।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...