বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অধিগ্রহণ করা জমির মালিকদের স্থাপনার ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকার প্রায় ৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। এরপর এসব স্থাপনা ভেঙে পাওয়া মূল্যবান নির্মাণসামগ্রী বিক্রি এবং সড়কের জন্য অধিগ্রহণ করা জায়গায় থাকা ভবনের অংশবিশেষ রেখে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। ফলে সরকারি অর্থে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পর স্থাপনা অপসারণ থেকে অর্জিত অর্থের কতটা সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, কর্ণফুলী টানেলকে কেন্দ্র করে যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ক্রসিং ওয়াই জংশন থেকে কালাবিবির দীঘির মোড় পর্যন্ত সড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয় সওজ। প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের আওতায় ফকিরনীর হাট, ফাজিলখাঁর হাট, বড়উঠান, চাতরী চৌমুহনী বাজার ও কালাবিবির দীঘির মোড়ের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে জমি অধিগ্রহণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, জমি অধিগ্রহণ ও স্থাপনার ক্ষতিপূরণ বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা।
জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ কার্যক্রম শেষে ২০২৫ সালের ২ জুলাই ক্রসিং ওয়াই জংশন থেকে কালাবিবির দীঘির মোড় পর্যন্ত বিভিন্ন পাকা ও আধাপাকা স্থাপনা ভাঙা এবং অপসারণের জন্য দরপত্র আহ্বান করে সওজ।
অভিযোগ রয়েছে, প্রথম দরপত্রেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে ‘মেসার্স জারা আয়রন মার্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা দর দেয়, যেখানে সওজের নির্ধারিত চাহিদা ছিল ২০ লাখ টাকা। এ ক্ষেত্রে একাধিকবার দরপত্র আহ্বানের প্রয়োজনীয়তা এবং প্রচলিত বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, স্থাপনা ভাঙার পর সেখান থেকে ২০০ টনের বেশি স্ক্র্যাপ লোহা, বিপুলসংখ্যক ইট এবং শত শত ট্রাক নির্মাণবর্জ্য বা রাবিশ বিক্রি করা হয়েছে। তবে এসব সামগ্রীর পরিমাণ, ওজন ও বিক্রয়মূল্যের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ না হওয়ায় প্রকৃত আয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, স্থাপনা অপসারণের কাজ থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা আয় হলেও সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে মাত্র ৩০ লাখ টাকা। বাকি অর্থের হিসাব নির্ধারণে স্ক্র্যাপ বিক্রির রসিদ, ওজনসংক্রান্ত নথি, কার্যাদেশ এবং সরকারি রাজস্ব জমার চালান যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্মাণসামগ্রী বিক্রির পাশাপাশি সড়কের জন্য অধিগ্রহণ করা জায়গায় থাকা একাধিক ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ অক্ষত রাখার বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।
ফাজিলখাঁর হাট এলাকায় সড়কের পূর্ব পাশে প্রায় ২০ ফুট বাই ৫০ ফুট আয়তনের একটি ভবনের অংশ রেখে দেওয়ার বিনিময়ে মালিকের কাছ থেকে ১৩ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই এলাকার সড়কের পশ্চিম পাশে একটি তিনতলা ভবন না ভেঙে রাখার বিনিময়ে ১০ লাখ টাকা এবং আরও দুটি ভবনের অংশবিশেষ অক্ষত রাখার বিনিময়ে ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
চাতরী চৌমুহনী বাজারেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়ভাবে ওয়ান মাবিয়া, হাজেরা মার্কেট, অগ্রণী ব্যাংক ভবন, একুশে প্লাজা ও আবুল হোসেন মার্কেটের সামনে সড়কের জন্য নির্ধারিত অংশ পুরোপুরি অপসারণ না করে রেখে দেওয়ার বিনিময়ে ভবনমালিকদের কাছ থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৫০ লাখ টাকার বেশি নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, এসব স্থাপনার কিছু অংশ এখনো দৃশ্যমান রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, স্থাপনা আংশিক বা সম্পূর্ণ অক্ষত রাখার বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সওজের একজন সার্ভেয়ারের যোগাযোগ ছিল। সার্ভেয়ার সুভাষীষ চাকমার বিরুদ্ধে স্থাপনা অপসারণ ও এ-সংক্রান্ত চুক্তির বিষয়গুলো দেখভালের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ফাজিলখাঁর হাট ও চাতরী চৌমুহনী এলাকায় বিভিন্ন স্থাপনা না ভাঙার বিনিময়ে অর্থ লেনদেন হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা, অর্থ লেনদেনের সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জারা আয়রন মার্টের স্বত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তিনি দ্রুত স্থানীয় লোকজনকে ডেকে বুঝিয়ে স্থাপনা ভাঙার কাজ শেষ করবেন। কোনো ভবন রেখে দেওয়ার বিনিময়ে মালিকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, স্থাপনা ভাঙার কাজ করতে গিয়ে তিনি রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হুমকি ও হামলার শিকার হয়েছেন।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম দক্ষিণ সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা বলেন, সওজের জায়গায় থাকা ভবন ভাঙা ও অপসারণের কাজ এখনো চলমান রয়েছে। কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না।
অধিগ্রহণ করা স্থাপনা ভাঙা, নির্মাণসামগ্রী বিক্রি, কথিত অর্থ লেনদেন এবং সরকারি কোষাগারে রাজস্ব জমার পরিমাণ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব পেতে প্রকল্পের দরপত্রসংক্রান্ত নথি, কার্যাদেশ, স্ক্র্যাপ বিক্রির হিসাব, অর্থ জমার চালান এবং সরেজমিনে স্থাপনা অপসারণের অগ্রগতি যাচাই করা জরুরি।
জনস্বার্থে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তার দায় নির্ধারণ, সরকারি সম্পদের সঠিক হিসাব প্রকাশ এবং সরকারি রাজস্বের যথাযথ আদায় নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই ও পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা গেলে প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং স্থাপনা অপসারণের কার্যক্রম নিয়ে বিদ্যমান অস্পষ্টতা দূর হতে পারে।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
সর্বশেষ
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...