বিজ্ঞাপন
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মূলত বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের কিছু দাবি উপাচার্য কর্তৃক পূরণ না হওয়ায় এ সংকটের সূচনা। এর ফলে শিক্ষক সমাজ স্পষ্টভাবে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। গত ১১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত রিজেন্ট বোর্ডের ৫৭তম সভায় গৃহীত কয়েকটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করেই মতবিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষক ও ইউট্যাবের সাংগঠনিক সম্পাদক এবিএম সাইফুল ইসলামের অধ্যাপক পদে পদোন্নতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রিজেন্ট বোর্ডের এক সদস্য জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কমপক্ষে চার বছরের বাস্তব শিক্ষাদানের অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। কিন্তু এবিএম সাইফুল ইসলাম সেই শর্ত পূরণ করেননি। পাশাপাশি স্বীকৃত জার্নালে মোট ১০টি গবেষণা প্রকাশনার শর্ত থাকলেও, সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ছয়টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করতে না পারায় বিষয়টি বিধিবহির্ভূত উল্লেখ করে বোর্ডে স্থগিত করা হয়।
এছাড়া আইন ও ভূমি প্রশাসন অনুষদের ডিন অধ্যাপক জামাল হোসেনের স্ত্রী জিনাত নাসরিন সুলতানার নিয়োগের বিষয়টিও রিজেন্ট বোর্ডে অনুমোদন পায়নি। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগে একজন শিক্ষক নিয়োগের কথা উল্লেখ থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, অধ্যাপক জামাল হোসেন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তার স্ত্রীকে নিয়োগ দিতে নিয়োগ বোর্ডের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন। সংশ্লিষ্ট পদটির অনুমোদন না থাকায় নিয়োগ বোর্ড ভবিষ্যতে ইউজিসির অনুমোদন সাপেক্ষে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও রিজেন্ট বোর্ড এটিকে সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূত ঘোষণা করে বাতিল করে। বরং নতুন করে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়।
এই দুটি সিদ্ধান্ত নিজেদের অনুকূলে না যাওয়ায় বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের একটি অংশ রিজেন্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান ও উপাচার্যের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ তোলে। রিজেন্ট বোর্ড-পরবর্তী সময়ে অভ্যন্তরীণ বিভাজন থাকলেও তা এতদিন প্রকাশ্যে আসেনি। তবে বিজয় দিবস উদযাপনকে কেন্দ্র করে উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলাম এবং উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম হেমায়েত জাহানের নেতৃত্বাধীন গ্রুপের দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিজয় দিবসের আগ মুহূর্তে উপ-উপাচার্য গ্রুপটি উপাচার্যের কাছে দুটি শর্ত দেয়। শর্ত দুটি হলো—সম্প্রতি শাস্তিপ্রাপ্ত দুই কর্মকর্তার শাস্তি প্রত্যাহার করে স্বপদে বহাল করা এবং বেসিক সায়েন্স অনুষদের শিক্ষক অধ্যাপক মামুন-উর-রশিদকে নবগঠিত ওশানোগ্রাফি অনুষদের ডিন হিসেবে নিয়োগ দেওয়া। এসব শর্ত পূরণ না হলে তারা বিজয় দিবস উদযাপনে অংশ নেবে না বলে জানায়। উপাচার্য এসব দাবিতে সম্মতি না দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
উল্লেখ্য, গত ৪ নভেম্বর এক কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে হেনস্তা ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় খণ্ডকালীন কর্মকর্তা মো. লোকমান হোসেন (মিঠু) ও মো. মাহমুদ-আল-জামানকে সহকারী রেজিস্ট্রার পদ থেকে সেকশন অফিসার পদে পদাবনতি করা হয়।
১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উপলক্ষে উপাচার্য সব পক্ষকে একসঙ্গে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানালেও উপ-উপাচার্য গ্রুপটি শর্ত পূরণ না হলে কর্মসূচিতে অংশ নেবে না—এমন সিদ্ধান্তে অটল থাকে। শেষ পর্যন্ত উপাচার্য জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণসহ নির্ধারিত কর্মসূচি সম্পন্ন করেন।
এ সময় উপ-উপাচার্য গ্রুপটি উপাচার্যের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধী অভিযোগ তুলে স্লোগান দেয় এবং তাকে জামায়াতপন্থী আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে বক্তব্য প্রদান করে।
জাতীয় কর্মসূচি বর্জনের কারণ জানতে চাইলে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম হেমায়েত জাহান বলেন, “আমরা বিগত বছরগুলোতে জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের সঙ্গে একসঙ্গে কর্মসূচি করেছি। কিন্তু এবার ভিসি স্যারের কাছে আমাদের দাবি ছিল—আমরা তাদের সঙ্গে একসঙ্গে শহীদ মিনারে যাব না। ভিসি স্যার আমাদের কথা শোনেননি। তাই আমরা কর্মসূচিতে যাইনি।”
তবে দুই কর্মকর্তার শাস্তি মওকুফ ও অধ্যাপক মামুন-উর-রশিদকে ডিন নিয়োগের শর্তের বিষয়ে তিনি বলেন, “এগুলো ভুল তথ্য। এ ধরনের কোনো আলোচনা আমাদের হয়নি।”
অন্যদিকে, উপ-উপাচার্যের অনুগত শিক্ষক ও আইন ও ভূমি প্রশাসন অনুষদের ডিন অধ্যাপক জামাল হোসেন শাস্তি মওকুফের দাবির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “এই বিষয়গুলো তো আছেই। ভিসি অনেক সিদ্ধান্ত আমাদের কাছে অসংলগ্ন মনে হয়। রিজেন্ট বোর্ডে যেসব বিষয় চূড়ান্ত হয়েছিল, তিনি সেগুলো ফিরিয়ে এনেছেন।”
এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, “জাতীয় দিবসের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনে উপ-উপাচার্যের এ ধরনের আচরণ এবং আমাকে জিম্মি করে অনৈতিক দাবি তোলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। সংবিধানস্বীকৃত পদে থেকে এ ধরনের বক্তব্য ও কর্মসূচি কোনোভাবেই সমীচীন নয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমি নিজেও বিএনপিপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। কিন্তু উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমাকে অবশ্যই বিধি ও নিয়মের মধ্যে থাকতে হয়। আমাকে যেভাবে অযাচিতভাবে ট্যাগিং করা হচ্ছে, তা হীন উদ্দেশ্যপ্রসূত। আমি বারবার সবাইকে নিয়ে বিজয় দিবস উদযাপনের আহ্বান জানিয়েছি। কিন্তু দুটি শর্ত পূরণ না হওয়ায় তারা অংশ নেয়নি। পরে উপস্থিত শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে বিজয় দিবস উদযাপন করা হয়েছে।”
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...