বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশই যুবসমাজ। বয়সসীমা নির্ধারণে ভিন্নতা থাকলেও সাধারণভাবে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদেরই যুবক হিসেবে ধরা হয়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ২০ শতাংশ এবং উচ্চশিক্ষিতদের ক্ষেত্রে এই হার ১৩.৫৪ শতাংশ, যা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। এছাড়া প্রতি বছর প্রায় ১৫–১৬ লাখ মানুষ নতুন করে শ্রমশক্তিতে যুক্ত হচ্ছে, অথচ প্রচলিত চাকরির বাজারে তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আত্মকর্মসংস্থান এখন বাস্তবসম্মত বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে, আর সেই ক্ষেত্রে কৃষি হতে পারে একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।
তবে একটি প্রচলিত ধারণা হলো—যুবকেরা কৃষি পেশায় আগ্রহী নয়। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। সঠিক পরিবেশ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, ন্যায্য বাজারমূল্য এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে অনেক যুবকেই কৃষিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করতে আগ্রহী। সময়ের ব্যবধানে মাছ চাষ, পশুপালন, ফল ও উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনে যুবকদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু দানাদার শস্য উৎপাদনে তুলনামূলক অনীহা দেখা যায়, কারণ এই কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ব্যঙ্গ করে “ক্ষেত” বলা হয়—যা যুবসমাজ সহজে মেনে নিতে পারেন না।
প্রকৃতপক্ষে, যুবসমাজ শুধু আয়ের সুযোগ খোঁজে না; তারা চায় সম্মান, পরিচিতি ও মর্যাদা। সমাজবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে, কোনো পেশার মূল্যায়ন নির্ধারিত হয় সেই পেশার সঙ্গে যুক্ত প্রতীকী মর্যাদা (symbolic status), সামাজিক স্বীকৃতি এবং পরিচয়ের ভিত্তিতে। যখন কোনো পেশা- যেমন কৃষি, সামাজিকভাবে কম মর্যাদাসম্পন্ন বলে বিবেচিত হয়, তখন যুবকেরা সেই পেশায় নিজেকে সংযুক্ত করতে চায় না, যদিও সেখানে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকে। সামাজিক পরিচয় তত্ত্ব (Social Identity Theory) অনুযায়ী, মানুষ এমন পরিচয় বেছে নিতে চায় যা তাকে সমাজে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে এবং তার আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি করে। একইভাবে, প্রতীকী মিথস্ক্রিয়াবাদ (Symbolic Interactionism) অনুসারে প্রতিদিনের সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় বিভিন্ন পেশা সম্পর্কে জনমনে যে ধারণা তৈরি হয়, তা ব্যক্তির পেশা নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। যেহেতু “কৃষক” পরিচয়টি সামাজিকভাবে কম গুরুত্ব পায়, তাই যুবকেরা সচেতনভাবেই তা এড়িয়ে চলেন। তারা এমন একটি পেশা বেছে নিতে চায়, যেখানে তাদের জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার যথাযথ মূল্যায়ন করার সুযোগ থাকবে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এখনও কৃষি পেশাটি তার প্রাপ্য মর্যাদা পায় না। কৃষক শ্রেণিকে প্রকাশ্যে সম্মান দেখানো হলেও বাস্তবে এই পেশাকে অবমূল্যায়ন করা হয় এবং প্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে অনেক সময় বঞ্চিত করা হয়। ফলশ্রুতিতে, অনেক শিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত যুবক কৃষিতে আসতে দ্বিধাবোধ করেন। এই পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত সমাধান বের করতে না পারলে নিকট ভবিষ্যতে কৃষিকাজ করার মতো মানুষের সংকট দেখা দিতে পারে।
এ ধরনের সংকট নতুন নয়। দ্রুত উন্নয়নশীল দেশ চীনও একসময় একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। দীর্ঘদিন এক সন্তান নীতির (বর্তমানে রহিত) কারণে তৈরি হওয়া ৪-২-১ পারিবারিক কাঠামোতে (৪ জন দাদা-দাদি, ২ জন বাবা-মা, ১ জন সন্তান) তরুণদের ওপর পারিবারিক চাপ বৃদ্ধি পায়। ফলে তারা কৃষি পেশা ছেড়ে অধিক আয়ের আশায় শহরমুখী হয় এবং গ্রামে শ্রমসাধ্য কৃষি পেশায় লোকের সংকট দেখা দেয়। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় চীন “গ্রামীণ পুনরুজ্জীবন কৌশল” (Rural Revitalization Strategy)-২০১৭ গ্রহণ করে। এর আওতায় প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি (যেমন রোবট, স্যাটেলাইট, বিগ ডেটা ও ড্রোনের ব্যবহার), গ্রামীণ উদ্যোক্তা তৈরি, ই-কমার্স, প্রশিক্ষণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মতো বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ফলাফল বেশ ইতিবাচক, যুবকদের অংশগ্রহণ বেড়েছে এবং কৃষি খাত হয়ে উঠেছে আধুনিক, টেকসই ও আকর্ষণীয়।
বাংলাদেশেও কিছু অঞ্চলে একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কৃষিতে অনীহা, প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা এবং শ্রমিক সংকটের কারণে কিছু জমি অনাবাদি থাকছে বা ফসলের নিবিড়তা কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে বরিশাল ও কুমিল্লা অঞ্চলে এই প্রবণতা বেশ লক্ষণীয়—তরুণদের শহরমুখী হওয়া বা বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রবণতা বাড়ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে এবং অন্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই সময় থাকতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
যুবকদের প্রত্যাশার সাথে সংগতি রেখে, পরিচিতির সংকট কাটাতে “কৃষক” শব্দের পরিবর্তে “কৃষি উদ্যোক্তা” বা “কৃষি ব্যবসায়ী” নামের প্রচলন করা যেতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন-দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব স্তরে কৃষির প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। তরুণরা নিজেদের যেভাবে দেখতে চায়, সেই আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। তাদের উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা এবং উদ্যোক্তা মনোভাবকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে পারলেই কৃষি খাত নতুন প্রাণ পাবে।
এই বাস্তবতায় “কৃষক কার্ড” গুরুত্বপূর্ণ হলেও এককভাবে যথেষ্ট নয়। কৃষক কার্ডকে শুধু সেবা প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর রূপান্তরের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে চীনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সফলতা পাওয়া যেতে পারে—
১. কৃষক কার্ডের সঙ্গে ডিজিটাল কৃষি সেবা (অ্যাপ/ডাটাবেজ) সংযুক্ত করে যুবকদের প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে উৎসাহিত করা।
২. প্রশিক্ষণ, ইনকিউবেশন ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের মাধ্যমে তরুণদের কৃষিতে দক্ষ করে তোলা।
৩. কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপ ও কৃষি-উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ তহবিল ও সহজ ঋণ সুবিধা চালু করা।
৪. কৃষিপণ্যের উৎপাদন, সরবরাহ ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে বৃহৎ কৃষি কোম্পানির সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন, শক্তিশালী বাজার ব্যবস্থাপনা এবং সরাসরি বিপণন প্ল্যাটফর্ম (ই-কমার্স) তৈরি করা।
৫. সমবায়, যৌথ উদ্যোগভিত্তিক চাষাবাদ (collective farming) ও সমলয় মডেল প্রসার করে ঝুঁকি কমানো ও লাভ বৃদ্ধি করা।
৬. স্থানীয় ও জাতীয় নীতি নির্ধারণী কমিটিতে যুব কৃষকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ।
৭. সফল যুবক কৃষি উদ্যোক্তাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পুরস্কারের মাধ্যমে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করা।
সবশেষে বলা যায়, কৃষক কার্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা, কিন্তু এটি কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়। এর সফলতা নির্ভর করবে আমরা কৃষিকে কতটা সম্মানজনক, প্রযুক্তিনির্ভর ও লাভজনক খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারি তার ওপর। যুবসমাজকে শুধু সুবিধা দিয়ে নয়, তাদের স্বপ্ন, মর্যাদা ও প্রত্যাশার সঙ্গে সমন্বয় করে কৃষিতে আগ্রহী করে তুলতে হবে। তবেই কৃষি হয়ে উঠবে আগামী দিনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত এবং একটি গর্বের পেশা।
লেখক-
মো. ওয়াকিলুর রহমান
প্রফেসর, গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: [email protected]
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
সর্বশেষ
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...