বিজ্ঞাপন
মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটেছে ৪১তম বিসিএস (নন-ক্যাডার) কর্মকর্তা এবং কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট বিভাগের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর সাথে। রোববার (২৬ এপ্রিল) বিকেলে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর নিজ বাড়িতে মরদেহ পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
জানা যায়, ২০২২ সালের ২২ এপ্রিল উর্মি হীরার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন বুলেট। আগামী ২৯ এপ্রিল তাঁদের বিবাহবার্ষিকী। অন্যদিকে, আগামীকাল ২৭ এপ্রিল তাঁদের একমাত্র ছেলে অব্যয় বৈরাগীর প্রথম জন্মদিন। চাকরির সুবাদে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে তিনি কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। ১ এপ্রিল থেকে চট্টগ্রামের ৪৪তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে ছিলেন তিনি। মূলত সন্তান ও স্ত্রীর বিশেষ দিনগুলো উদযাপন করতেই শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) রাত ১১টায় চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেন বুলেট। কিন্তু পথিমধ্যে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের হাতে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তিনি।
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমরিয়া ইউনিয়নের বাবুপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সুশীল বৈরাগীর একমাত্র সন্তান ছিলেন বুলেট বৈরাগী। রোববার বিকেল ৫টার পর তাঁর মরদেহ নিজ গ্রামে এসে পৌঁছায়। এ সময় পরিবারের সদস্য, স্বজন ও প্রতিবেশীদের কান্নায় এলাকার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। স্ত্রী উর্মি হীরা নির্বাক হয়ে শেষবারের মতো স্বামীর নিথর দেহে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দেন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাড়ির উঠানের পাশে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বুলেট বৈরাগীর মরদেহ সমাহিত করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
ঘটনার রাতের স্মৃতিচারণ করে বুলেটের শাশুড়ি মমতা হীরা জানান, রাত ১২টার দিকে মেয়ে উর্মির সাথে তাঁর কথা হয়। উর্মি জানিয়েছিল, বুলেট বাড়ি আসছে এবং তার পছন্দের খাবার রান্না করা হয়েছে। রাত দেড়টার দিকে বুলেটের বাড়ি পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু পরদিন সকালে মেয়ে জানায়, বুলেটকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি আর্তনাদ করে বলেন, "আমার নাতি মাত্র এক বছরের শিশু। তার প্রথম জন্মদিনের আগেই বাবাকে হারাল। যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, যাতে আর কোনো মায়ের কোল খালি না হয়।"
নিহতের মা নীলিমা বৈরাগী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, "চরম দারিদ্র্যের মধ্যে অনেক কষ্ট করে ছেলেকে মানুষ করেছি। আমার বুকের ধনকে যারা কেড়ে নিয়েছে, আমি তাদের বিচার চাই।"
স্বজনরা জানান, বুলেট অত্যন্ত শান্ত প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। অফিসে বা ব্যক্তিগত জীবনে কারও সাথে তাঁর কোনো শত্রুতা ছিল না। তাঁর চাচাতো বোন বৃষ্টি বৈরাগী বলেন, "আমার ভাইকে এত নির্মমভাবে মারা হয়েছে যে মুখ চেনা যাচ্ছে না। তার দাঁত ভেঙে ফেলা হয়েছে। আমরা খুনিদের ফাঁসি চাই।" বুলেটের চাচা বিমল বৈরাগী ও স্বজন মাধবীও এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন।
এদিকে, একজন মেধাবী ও সৎ কর্মকর্তাকে হারানোর শোকে মুহ্যমান তাঁর গ্রামের মানুষ। ডুমরিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনোজ কুমার মন্ডল তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, "বুলেট আমাদের বিদ্যালয়ের গর্ব ছিল। এমন একজন দক্ষ সরকারি কর্মকর্তাকে হারানো দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা অবিলম্বে খুনিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।"
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...