Logo Logo

কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট হত্যা ছেলের জন্মদিন পালন করা হলো না


Splash Image

মূলত সন্তানের জন্মদিন ও বিবাহবার্ষিকী ঘিরেই শুক্রবার রাত ১১টায় চট্টগ্রাম থেকে রওনা দেন বুলেট। উর্মি হীরা জানান, সন্তানের জন্মদিন পালন করে রোববার ভোরেই বুলেট চট্টগ্রামে ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বুলেটের সেই ইচ্ছে আর পূরণ হলো না।


বিজ্ঞাপন


২০২২ সালের ২২ এপ্রিল উর্মি হীরা ও বুলেট বৈরাগীর বিয়ে হয়। বুধবার (২২ এপ্রিল) ছিল এ দম্পতির বিবাহবার্ষিকী। তবে চট্টগ্রামে প্রশিক্ষণে থাকায় বুলেট কুমিল্লায় পরিবারের কাছে আসতে পারেন নি। তাঁদের ছেলে অব্যয় বৈরাগীর জন্মও হয়েছে কুমিল্লা নগরের ভাড়া বাসায়। ২৭ এপ্রিল তার বয়স এক বছর পূর্ণ হবে।

বুলেট বৈরাগী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমরিয়া ইউনিয়নের বাবুপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সুশীল বৈরাগীর ছেলে। তিনি ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডার পদে কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট বিভাগে যোগদান করেন। এরপর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে। বিবিরবাজার থেকেই ১ এপ্রিল চট্টগ্রামে যান ৪৪তম বনিয়াদি প্রশিক্ষণে। চাকরির সুবাদে তিনি কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকার ওই ভাড়া বাসায় থাকতেন। নিহত বুলেট মা–বাবার একমাত্র সন্তান।

চট্টগ্রাম থেকে গত শুক্রবার রাতে কুমিল্লার বাসায় ফিরছিলেন বুলেট বৈরাগী (৩৫)। কাছাকাছি স্থানে পৌঁছে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একাধিকবার কথাও বলেছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর আর বাসায় ফেরা হয়নি। শনিবার সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকার আইরিশ হিল হোটেলের পাশে মিলেছে ওই কাস্টমস কর্মকর্তার মরদেহ। তাঁর মরদেহের মুখমণ্ডলে রক্তাক্ত চিহ্ন ছিল।

পরিবারের সদস্যদের ধারণা, বুলেট হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এ ঘটনায় শনিবার রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় হত্যা মামলা করেছেন মা নীলিমা বৈরাগী। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। আজ দুপুর পর্যন্ত হত্যার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।

গোপালগঞ্জ জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমরিয়া উত্তরপাড়ায় (বাবুপাড়া) বুলেট বৈরাগীর বাড়ি। টুঙ্গিপাড়া-তারাইল সড়কের পাশে বৈরাগী বাড়িতে আজ বিকেল ৫ টার পর কুমিল্লা থেকে বুলেট বৈরাগীর মরদেহ এসে পৌঁছায়। এ সময় পরিবারের সদস্য, স্বজন ও প্রতিবেশীদের আহাজারিতে এলাকার আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। সর্বত্রই শোকের ছায়া নেমে আসে । চোখে এক সাগর পানি নিয়ে স্ত্রী উর্মি হীরা শেষ বারের মতো স্বামীর নিথর দেহ পরম মমতায় আদর করে দেন। শোকার্ত স্ত্রীর আদর দেখে কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি।

সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টার দিকে বুলেটের মরদেহ কফিন বন্দী করা হয়। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সন্ধ্যা ৭ টার দিকে বাড়ির উঠানের পাশে ধর্মীয় আচার আনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে বুলেট বৈরাগীর মরদেহ সমাহিত করার প্রস্তুতি চলছিল ।

বুলেটের স্ত্রী উর্মি হীরা অন্য কিছু জানতে চান নি। তার স্বামীর সথে ওই রাতে কী হয়েছিল ? সেটা একটিবার জানতে চেয়েছেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে বুলেটের মা নীলিমা বৈরাগী বলেন, ‘বুলেট আমার একমাত্র সন্তান ও বুঁকের ধন । চরম দারিদ্রতার মধ্যে অনেক কষ্ট করে তাকে মানুষ করেছি । এ শোক আমি সইতে পারছি না। আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই ।’

বুলেটের শ্বাশুড়ি মমতা হীরা বলেন, “আমার একমাত্র মেয়ে উর্মি। তার বিয়ে হয়েছে ৪ বছর ৩ মাস আগে। তাদের ১টি ছেলে আছে, যার আগামীকাল ২৭ এপ্রিল প্রথম জন্মদিন।

ঘটনার আগের রাতে রাত ১২টার দিকে আমি আমার মেয়ের সাথে কথা বলেছিলাম। সে আমাকে বলেছিল, ‘মা, বুলেট বাড়ি আসতেছে, সে পনির খুব পছন্দ করে, তাই আমি পনির রান্না করেছি এবং বিরিয়ানি রান্না করেছি।’ বুলেট তখন বলেছিল, সে দেড়টার দিকে বাড়ি ফিরবে। এরপর আমি ঘুমিয়ে পড়ি।

পরদিন সকালে আমার মেয়ে ফোন করে জানায়, ‘মা, বুলেটকে আর খুঁজে পাচ্ছি না।’ এই খবর শোনার পর থেকে আমাদের পুরো পরিবার গভীর শোকে ভেঙে পড়েছে।

আমার নাতি মাত্র এক বছরের শিশু। তার প্রথম জন্মদিনের আগেই সে তার বাবাকে হারিয়েছে। চার বছরের সংসার জীবনে আমার মেয়ে আজ চরম অনিশ্চয়তা ও শূন্যতার মধ্যে পড়ে গেছে।

আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করছি। যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো মায়ের কোল এভাবে খালি না হয়।”

বুলেট বৈরাগী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমরিয়া ইউনিয়নের বাবুপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সুশীল বৈরাগীর ছেলে। তিনি ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডার পদে কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট বিভাগে যোগদান করেন। এরপর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন কুমিল্লার বিবির বাজার স্থলবন্দরে। বিবির বাজার থেকেই ১ এপ্রিল চট্টগ্রামে যান ৪৪তম বনিয়াদি প্রশিক্ষণে। চাকরির সুবাদে তিনি কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকার ওই ভাড়া বাসায় থাকতেন। নিহত বুলেট মা–বাবার একমাত্র সন্তান।

বুলেটের চাচা বিমল বৈরাগী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘জীবনে কাউকে নখের আঁচড়ও দেয়নি, কেউ তাঁর দিকে আঙুলও তোলেনি। সেই শান্ত ছেলেটির লাশ আজ রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে হলো। আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে।’

বুলেটের চাচাতো বোন বৃষ্টি বৈরাগী , “আমার ভাইকে এত নির্মমভাবে মারা হয়েছে যে, মুখ দেখে তাকে এখন আর চেনাই যাচ্ছে না। তার দাঁত ভেঙে ফেলা হয়েছে। আমার ভাই কখনো কারও সাথে ঝামেলা করত না। আমি নিজেও অফিসে গিয়ে দেখেছি, সে সবার সাথে খুব ভালোভাবে মিশত। যারা আমার ভাইকে হত্যা করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি -ফাঁসি চাই।"

বুলেটের স্বজন মাধবী বলেন, “আমরা খবর পাই যে একটি অজ্ঞাত লাশ পাওয়া গেছে এবং পরে ময়নাতদন্তের জন্য আমাদের জানানো হয়। এরপর সেখানে গিয়ে দাদার লাশটি শনাক্ত করে। এখন তিনি আমাদের মাঝে আর নেই—আমরা তাকে আর ফিরে পাব না। তবে আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচার আশা করি এবং দাবি করছি। এটি একটি হত্যাকাণ্ড বলে আমরা মনে করি। তার সাথে কারও শত্রুতা ছিল কিনা সে বিষয়ে আমরা কিছু জানতাম না। আমাদের জানা মতে, পারিবারিক কোনো কলহ ছিল না এবং অফিস বা কর্মস্থলেও কারো সাথে কোনো বিরোধ ছিল না।

তিনি একজন অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন। কারো সাথে কখনো ঝামেলা করতেন না, সবার সাথে খুব সুন্দরভাবে মিশে চলতেন। আমরা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সঠিক তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। "

ডুমরিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনোজ কুমার মন্ডল বলেন, বুলেট আমাদের বিদ্যালয়ের গর্ব ছিল। একজন সৎ ও দক্ষ সরকারি কর্মকর্তাকে এভাবে হারিয়ে ফেলা দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাই। অনতিবিলম্বে খুনীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...