বিজ্ঞাপন
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর সোমবার (১৮ মে) দুপুরে সুনামগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত উল্লেখ করেন, মামলায় উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণ, মেডিকেল রিপোর্ট এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আদালতের এই রায়ে ভুক্তভোগী পরিবার গভীর সন্তোষ ও স্বস্তি প্রকাশ করেছে।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন— ছাতক উপজেলার হাসামপুর গ্রামের মৃত আব্দুল খালিকের ছেলে মতিউর রহমান মতিন, খোয়াজ আলীর ছেলে দিলদার হোসেন এবং কামারগাঁও গ্রামের হাবিবুর ইসলামের ছেলে বিল্লাল হোসেন।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০২১ সালের ১১ আগস্ট সকালে ভুক্তভোগী তরুণী তার নানাবাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে ছাতকের হাসামপুর এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয় দুই বখাটে যুবক মতিউর রহমান ও দিলদার হোসেন তাকে জোরপূর্বক অপহরণ করে তুলে নিয়ে যায়। পরে আসামিরা তাকে উপজেলার সিংচাপইড় গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আটকে রেখে পালাক্রমে ধর্ষণ করে।
পরবর্তীতে ওই ধর্ষকদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বিল্লাল হোসেনসহ আরও এক অভিযুক্ত ভুক্তভোগীকে অন্য একটি গ্রামে নিয়ে গিয়ে পুনরায় ধর্ষণ করে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে কয়েকজন অভিযুক্তকে হাতেনাতে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে।
নৃশংস এই ঘটনার পর ভুক্তভোগী তরুণীর ভাই বাদী হয়ে ছাতক থানায় পাঁচজনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করলে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। দীর্ঘ সাক্ষ্যগ্রহণ, আইনি শুনানি ও উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে সোমবার এই মামলার রায় দেওয়া হলো।
আদালতের রায়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৭ ধারায় (অপহরণের অপরাধে) মতিউর রহমান মতিন ও দিলদার হোসেনকে ১৪ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। একই আইনের ৯(৩) ধারায় (গণধর্ষণের অপরাধে) এই দুই আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড, ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এছাড়া অপর আসামি বিল্লাল হোসেনকেও একই ধারায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ১ লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। তবে অপরাধের সাথে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত না হওয়ায় আব্দুস সোবহান নামের এক আসামিকে মামলা থেকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।
রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মতিউর রহমান ও দিলদার হোসেন আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। তবে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত অপর আসামি বিল্লাল হোসেন বর্তমানে পলাতক রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পিপি অ্যাডভোকেট মো. শামসুর রহমান।
পিপি অ্যাডভোকেট মো. শামসুর রহমান সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে ঘটনার যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ ও চাক্ষুষ সাক্ষী উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। বিজ্ঞ আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে এই ন্যায়সঙ্গত রায় দিয়েছেন। আমরা বিশ্বাস করি, এই রায়ের মাধ্যমে সমাজে ভুক্তভোগী পরিবারের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো জঘন্য সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে আদালতের এই কঠোর শাস্তি সমাজে একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে এবং অপরাধপ্রবণতা কমিয়ে আনতে ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে তারা পলাতক আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে রায় কার্যকর করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...