Logo Logo

তেঁতুলিয়ায় ৪০ কেজির পরিবর্তে ৪১ কেজিতে মণ, সিন্ডিকেটের কবলে মরিচ চাষিরা


Splash Image

দেশের প্রচলিত ওজন পরিমাপের নিয়ম অনুযায়ী ৪০ কেজিতে এক মণ নেওয়ার আইনি বিধান থাকলেও পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার শালবাহান হাটের মরিচ ব্যবসায়ীরা এই নিয়ম তোয়াক্কা করছেন না। তারা ‘ধলতা’ আদায়ের অজুহাতে সাধারণ কৃষকদের কাছ থেকে এক মণে ৪১ কেজি শুকনা মরিচ নিচ্ছেন। একই সাথে ওজনে কৃষকদের ১০০ থেকে ৯০০ গ্রাম মরিচ বেশি হলেও তা হিসাবে ধরছেন না অসাধু ব্যবসায়ীরা। মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের এমন সিন্ডিকেটের কারণে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন স্থানীয় মরিচ চাষিরা।


বিজ্ঞাপন


জানা গেছে, শুধু শালবাহান মরিচ হাটই নয়, বরং উপজেলাব্যাপী এভাবে কৃষকদের জিম্মি করে মরিচ কিনছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। সপ্তাহে দুই দিন—শনিবার ও বুধবার এই হাটে হাজার হাজার মণ শুকনা মরিচ বেচাকেনা হয়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ী চক্রটি কৃষকদের বাধ্য করে অতিরিক্ত মরিচ হাতিয়ে নিলেও দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

গত ১৬ মে শনিবার সরেজমিনে শালবাহান হাটে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকরা শুকনা মরিচ বিক্রির জন্য হাটে ভিড় করছেন। তবে বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই বেআইনি ধলতা পদ্ধতি যেন এখন এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শালবাহান বাজারের ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন চানু, মজনু মিয়া, সুবহান মাস্টার, রুবেল, ইয়াসিন ও গুরুদাসসহ কয়েকজন ব্যবসায়ী এই ধলতা পদ্ধতি ও সিন্ডিকেটের কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে আসছেন। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন চানু ও মজনু। তারা কৃষকদের কাছ থেকে মরিচ ক্রয়ের ক্ষেত্রে ৪০ কেজির পরিবর্তে ৪১ কেজিতে মণ হিসাব করছেন। এতে কৃষকরা ৪১ কেজি মরিচ দিয়ে দাম পাচ্ছেন মাত্র ৪০ কেজির। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি শুকনা মরিচ ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দরে বেচাকেনা হচ্ছে।

কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে গেলেও বাজারে তারা পণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। এর ওপর ওজনে কারচুপির কারণে বাধ্য হয়ে লোকসান দিয়ে তাদের মরিচ বিক্রি করতে হচ্ছে।

হাটে মরিচ বিক্রি করতে আসা কৃষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমরা অনেক কষ্ট করে মরিচ চাষ করি। কিন্তু হাটে এনে ৪১ কেজিতে মণ বিক্রি করতে হচ্ছে, যা দিনদুপুরে কৃষকদের পকেট কাটার শামিল। ওজনে এক কেজি বেশি নিয়ে ব্যবসায়ীরা প্রতি মণে একজন কৃষকের ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা অনায়াসে হাতিয়ে নিচ্ছেন।" কৃষকরা আরও জানান, কৃষি অফিস, স্থানীয় প্রশাসন কিংবা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর—কেউই বাজার পরিদর্শনে আসেন না। ব্যবসায়ীরা কেন ৪০ কেজির জায়গায় ৪১ কেজি নিচ্ছেন, তা খতিয়ে দেখতে তারা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

চাষিদের অভিযোগ, বাজারে নিযুক্ত কিছু মধ্যস্বত্বভোগী ব্যক্তি ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট তৈরি করে এই পদ্ধতি টিকিয়ে রেখেছেন। ফলে সাধারণ কৃষকরা এককভাবে প্রতিবাদ করেও কোনো সুফল পাচ্ছেন না। তবে অসাধু ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, এটি নতুন কোনো নিয়ম নয়, বরং বহু বছর ধরে বাজারে প্রচলিত একটি পদ্ধতি।

মরিচে এক কেজি বেশি নেওয়ার কথা স্বীকার করে ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন চানু বলেন, "কৃষকরা মরিচ ভালোভাবে বেছে নিয়ে আসে না। ওই সব মরিচ আমাদের পুনরায় বাছতে হয়, যাতে প্রচুর বিচি পাওয়া যায়। এই ক্ষতি পোষাতে এবং মহাজনকে ৫০ কেজি ওজনের বস্তায় এক কেজি বেশি দেওয়ার নিয়ম থাকায় আমরা কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত এক কেজি নিই।" ব্যবসায়ী মজনু মিয়া প্রথমে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানালেও পরবর্তীতে একই অজুহাত দেখান।

বাইরে থেকে আসা ‘ভাই ভাই বাণিজ্যলয়’ প্রতিষ্ঠানের এক ব্যবসায়ী বলেন, "বাজারে সবাই যেভাবে নিচ্ছে, আমরাও সেভাবে নিচ্ছি। যুগ যুগ ধরে এই নিয়ম চলে আসছে, এখানে ৪০ কেজিতে মণ কেউ নেয় না।"

শালবাহান হাটের ইজারাদার রফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি কেবল অনুমোদিত হাট-বাজারের সরকারি টোল আদায় করছেন। মরিচ ব্যবসায়ীরা ৪০ নাকি ৪১ কেজিতে মণ নিচ্ছেন, সেটি তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়; এই ব্যাপারে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তেঁতুলিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার সাবরিনা আফরিন বলেন, বাজারের পণ্য ক্রয়-বিক্রয় বা ওজন মনিটরিং করার দায়িত্ব তার দপ্তরের আওতাভুক্ত নয়। অন্যদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পঞ্চগড় জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তার মন্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার মুঠোফোনে কল করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

তবে কৃষকদের আশ্বস্ত করে তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আফরোজ শাহীন খসরু বলেন, "আইন বহির্ভূতভাবে যেসব ব্যবসায়ী ৪১ কেজিতে মণ নিচ্ছেন, তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রান্তিক কৃষকদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা এবং ওজনের এই অবৈধ সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে প্রশাসনের কঠোর ও কার্যকর হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...