Logo Logo

বাজেটে লিঙ্গ সমতার আড়ালে পুরুষ বঞ্চনা ও সামাজিক ভারসাম্যহীনতা


Splash Image

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে জেন্ডার রেসপন্সিভ কাঠামোর আওতায় ৩ লাখ ২৬ হাজার ৫৯.৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের প্রায় ৩৪.৮ শতাংশ । খাতা-কলমে এটিকে নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের এক বিশাল মাইলফলক হিসেবে প্রচার করা হলেও, এর নেপথ্যে থাকা গভীর সামাজিক ভারসাম্যহীনতা, একপেশে আইনি কাঠামো এবং পুরুষদের চরম বঞ্চনার বিষয়টি সম্পূর্ণ আড়ালে রয়ে গেছে।


বিজ্ঞাপন


সাম্প্রতিক সময়ে সচেতন নাগরিক সমাজ ও সমাজবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, লিঙ্গভিত্তিক এই চরম অসম নীতি ও একতরফা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা সমাজে এক ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, পারিবারিক বিশৃঙ্খলা এবং পুরুষদের জন্য এক অবর্ণনীয় ও প্রাণঘাতী পরিবেশ তৈরি করছে।

১. ‘জেন্ডার বাজেট’ নাকি আন্তর্জাতিক ঋণ পাওয়ার স্টান্ট?

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৩ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল জেন্ডার বাজেট মূলত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF), বিশ্বব্যাংক এবং পশ্চিমা দাতা সংস্থাগুলোকে সন্তুষ্ট করার একটি "রাজনৈতিক স্টান্ট" ও পিআর এক্সারসাইজ। মেগা প্রজেক্ট, রাস্তাঘাট ও বিদ্যুৎ খাতের মতো সাধারণ অবকাঠামোগত ব্যয়কে "নারীরাও এর সুবিধা পাবে" এই যুক্তি দেখিয়ে জেন্ডার বাজেটের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে । ফলে কাগজের অংক ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলা হলেও, মাঠপর্যায়ে সাধারণ দরিদ্র নারী বা পুরুষ—কারও জীবনযাত্রারই প্রকৃত ও গুণগত রূপান্তর ঘটছে না।

২. একপেশে আইনি কাঠামো ও ক্ষমতার অপব্যবহার: পুরুষের জন্য নতুন ফাঁদ

প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাষ্ট্র যখন কোনো নীতি বা বাজেটের মাধ্যমে একতরফাভাবে একটি নির্দিষ্ট লিঙ্গকে অতিরিক্ত আইনি ও অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে থাকে, তখন সমাজে শক্তির ভারসাম্যে (Power Dynamics) বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে।

নারীদের সুরক্ষার জন্য তৈরি কঠোর আইনগুলোর (যেমন: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন) চরম অপব্যবহারের অভিযোগ এখন দিন দিন আকাশচুম্বী। পারিবারিক বা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে অনেক পুরুষ ও তাদের পরিবারকে এই ধরনের মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে সামাজিকভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। অথচ একজন পুরুষ যখন নিজের পরিবার বা স্ত্রীর দ্বারা মানসিক বা শারীরিকভাবে চরম নির্যাতনের শিকার হন, তখন তার রাষ্ট্রীয় আইনি প্রতিকার পাওয়ার কোনো সুযোগই নেই। পুরুষদের সুরক্ষায় দেশে সুনির্দিষ্ট কোনো সেল বা আইন না থাকায় এই নির্যাতনগুলো সমাজ ও আইনি কাঠামোর সম্পূর্ণ "কল্পনার বাইরে" থেকে যাচ্ছে।

৩. দায়িত্বের বোঝা পুরুষের, সুবিধা কেবল এক লিঙ্গের

দক্ষিণ এশীয় সামাজিক কাঠামোয় এখনও একটি পরিবারের মূল অর্থনৈতিক দায়িত্ব, ঋণের বোঝা এবং উপার্জনের প্রধান চাপ পুরুষের ওপরই বর্তায়। অথচ রাষ্ট্র যখন সহায়তার হাত বাড়ায়, তখন তা শুধু লিঙ্গ বিবেচনায় ভাগ করা হয়। একজন বেকার বা দরিদ্র পুরুষ যখন দেখেন কেবল লিঙ্গের কারণে তিনি রাষ্ট্রীয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তখন তার মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও বঞ্চনাবোধ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

শিক্ষা ও উপবৃত্তির ক্ষেত্রে একতরফা নারী-কেন্দ্রিক নীতির কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলে দরিদ্র পরিবারের ছেলেরা স্কুল থেকে ব্যাপক হারে ঝরে পড়ছে এবং উপার্জনের জন্য শিশুশ্রমে বাধ্য হচ্ছে। ফলে সমাজ অজান্তেই পুরুষদের একটি বড় অংশকে স্থায়ীভাবে পিছিয়ে দিচ্ছে।

৪. মূলধারার মিডিয়ার একপেশে ভূমিকা ও ‘নীরব কান্না’

মিডিয়া এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিশ্বব্যাপী এবং জাতীয় পর্যায়ে কেবল নারী লিঙ্গের সুবিধা ও অধিকারের বাণী আওড়ায়, যার ফলে পুরুষ নির্যাতনের বাস্তব চিত্রগুলো সমাজ ও নীতি নির্ধারকদের সম্পূর্ণ লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায়। সামাজিক লোকলজ্জা এবং "পুরুষ মানুষ নির্যাতিত হতে পারে না"—এই ট্যাবু বা কুসংস্কারের কারণে কোটি কোটি পুরুষ তাদের ওপর হওয়া মানসিক ও সামাজিক অবদমন মুখ বুজে সহ্য করে যাচ্ছেন। এই একাকীত্ব, তীব্র মানসিক ট্রমা এবং আইনি হয়রানির শিকার হয়ে অনেক পুরুষ চরম হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছেন, যা অনেক ক্ষেত্রে আশঙ্কাজনকভাবে আত্মহত্যার মতো প্রাণঘাতী পরিণতি ডেকে আনছে।

৫. সমাধান কোথায়: লিঙ্গভিত্তিক নয়, প্রয়োজন শ্রেণীভিত্তিক বাজেট

বিশেষজ্ঞদের মতে, "দারিদ্র্যের কোনো লিঙ্গ হয় না।" একজন সুবিধাপ্রাপ্ত উচ্চবিত্ত নারী একজন খেটে খাওয়া দিনমজুর বা রিকশাচালক পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি ভালো অবস্থানে থাকেন। তাই রাষ্ট্রীয় নীতি যদি লিঙ্গভিত্তিক (Gender-based) না হয়ে সম্পূর্ণ আর্থিক অবস্থা বা শ্রেণীভিত্তিক (Class-based/Income-based) হতো, তবে সমাজ অনেক বেশি সুষম হতো। তখন রাষ্ট্রের সাহায্য লিঙ্গ না দেখে সরাসরি প্রকৃত গরিব ও যোগ্য মানুষের কাছে পৌঁছাত।

যতক্ষণ না পর্যন্ত রাষ্ট্র পুরুষদের অধিকার, আইনি সুরক্ষা এবং মানসিক স্বাস্থ্যকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই ধরনের একপেশে বাজেট ও সামাজিক নীতি কেবল সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও পুরুষ নির্যাতনের তীব্রতাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।

-লেখক : মো. আরাফাত রহমান, কলামিস্ট ও সাংবাদিক, সাবেক শিক্ষার্থী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...