Logo Logo

৪৪ বছরেও সরকারিকরণ হয়নি কর্ণফুলী আবদুল জলিল চৌধুরী কলেজ


Splash Image

দক্ষিণ চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার একমাত্র উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী আবদুল জলিল চৌধুরী কলেজ। প্রতিষ্ঠার ৪৪ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সরকারি কলেজের মর্যাদা পায়নি ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে কলেজটি সরকারিকরণের দাবি জানিয়ে আসছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। এবার সেই দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। স্থানীয় সংসদ সদস্যও কলেজটি সরকারিকরণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।


বিজ্ঞাপন


১৯৮২ সালে মরহুম আবদুল জলিল চৌধুরীর স্মরণে তাঁর একমাত্র পুত্রবধূ মরহুম নুরুন্নাহার বেগম চৌধুরীর উদ্যোগে কলেজটির যাত্রা শুরু হয়। চৌধুরী পরিবারের পুত্রবধূ, মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের দান করা প্রায় ২ দশমিক ৭৮ একর জমির ওপর অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়ে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি সময়ের সঙ্গে সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৩ দশমিক ৬ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা কলেজটিতে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।

কলেজটিতে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চালু রয়েছে। পাশাপাশি ডিগ্রি পর্যায়ে বিএসএস ও বিবিএস কোর্স পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনেও এইচএসসি কার্যক্রম রয়েছে।

প্রতিষ্ঠার ছয় বছর পর ১৯৮৮ সালে কলেজটি কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৯৩ সালে এমপিওভুক্ত এবং ১৯৯৮ সালে স্নাতক (ডিগ্রি) পর্যায়ে উন্নীত হয়। পরবর্তীতে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এইচএসসি কার্যক্রম চালু করা হয়। বর্তমানে কলেজে ৩৫ জন শিক্ষক ও ১৬ জন কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন।

সময়ের সঙ্গে কলেজটির অবকাঠামোগত সক্ষমতাও বেড়েছে। রয়েছে আধুনিক ভবন, ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ, আইসিটি ল্যাব, বিজ্ঞানাগার, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, খেলার মাঠ ও সিসি ক্যামেরা-নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তাব্যবস্থা। সহশিক্ষা কার্যক্রমেও রয়েছে নানা সুযোগ। তিনটি রোভার স্কাউট ইউনিট, যুব রেড ক্রিসেন্ট ইউনিট, সাংস্কৃতিক ফোরাম, ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, বিতর্ক ক্লাব, বিজ্ঞান ক্লাব ও বৃক্ষরোপণ ক্লাবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে। কলেজ কর্তৃপক্ষের দাবি, রোভার স্কাউট ইউনিটগুলো চট্টগ্রাম জেলার মধ্যে দুইবার শ্রেষ্ঠ নির্বাচিত হয়েছে। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়েও শিক্ষার্থীরা সাফল্য অর্জন করে আসছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কর্ণফুলী উপজেলায় সরকারি কলেজ না থাকায় এই প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্ব অনেক বেশি। উপজেলার বড় একটি অংশের শিক্ষার্থী নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পড়াশোনার ব্যয় বহন করা অনেক পরিবারের জন্য কঠিন। কলেজটি সরকারি হলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ব্যয় কমার পাশাপাশি ঝরে পড়ার হারও কমবে বলে মনে করছেন তাঁরা।

সরকারিকরণ হলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স কোর্স চালুর পথ উন্মুক্ত হওয়ার পাশাপাশি অবকাঠামো, আধুনিক ল্যাব, লাইব্রেরি ও অন্যান্য শিক্ষাসুবিধা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। এতে কর্ণফুলীর উচ্চশিক্ষার পরিধিও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।

কলেজটি সরকারিকরণের জন্য অতীতেও একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কলেজ সংশ্লিষ্টদের দাবি, সাবেক ভূমিমন্ত্রী ২০২০ ও ২০২২ সালে এ বিষয়ে দুই দফা ডিও লেটার দিয়েছিলেন। তবে বিভিন্ন কারণে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।

সাবেক অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ২০১৬ সালে কর্ণফুলী উপজেলা গঠনের পর থেকেই কলেজটি সরকারি করার চেষ্টা চলছে। ২০২০ ও ২০২২ সালে এ আসনের সাবেক মন্ত্রী ডিও লেটার দিলেও নানা কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের কাছে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তিনি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সমীর রঞ্জন নাথ বলেন, কর্ণফুলীর প্রাচীনতম কলেজ হিসেবে এটি সরকারি করার জন্য আবেদন করা হয়েছে। সংসদ সদস্যের সহযোগিতায় দ্রুত সরকারিকরণ হবে—এ প্রত্যাশায় শিক্ষক-কর্মচারী ও এলাকাবাসী অপেক্ষা করছেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারাও দাবিটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা এনসিপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শাহিদুল ইসলাম সাহেদ বলেন, কলেজটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি কর্ণফুলীর গর্ব ও ঐতিহ্য। সরকারিকরণ হলে গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা কম খরচে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নিয়মিত হওয়া এবং ল্যাব, লাইব্রেরি ও অবকাঠামোর উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতে ইসলামীর শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক এবং কলেজ গভর্নিং বডির সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ ইমাইল হক্কানী বলেন, দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং মানসম্মত শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে কলেজটি জাতীয়করণ জরুরি। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বল্পতা দূর করার পাশাপাশি এটি উপজেলার আর্থসামাজিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে।

বিএনপি নেতা ও কলেজ গভর্নিং বডির সদস্য অ্যাডভোকেট এসএম ফোরকান বলেন, প্রতিটি উপজেলায় একটি কলেজ সরকারি করার সিদ্ধান্ত থাকলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এ কলেজটি সরকারি করা হয়নি। বর্তমানে স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামকে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তা তুলে ধরার আশ্বাস দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য এসএম মামুন মিয়া বলেন, ১৯৯১ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ঐতিহাসিক আবদুল জলিল চৌধুরী কলেজ মাঠে বিশাল নির্বাচনী জনসভায় এসেছিলেন। বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও তিনি এ মাঠে ভাষণ দিয়েছেন। খালেদা জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত কলেজটি সরকারিকরণের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর কাছে দাবি জানান।

কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি ও কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রিদুয়ানুল ইসলাম বলেন, কলেজটি সরকারি করা হলে এলাকার শিক্ষার মানোন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। এতে কর্মরত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মনোবল বাড়বে এবং অনার্স ও ডিগ্রি পর্যায়ে নতুন বিষয় চালুর সুযোগ সৃষ্টি হবে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন, তিনি একসময় কলেজটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। তিনি দ্রুত কলেজটি সরকারিকরণের পক্ষে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। তাঁর আশা, দ্রুতই সরকারিকরণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এরই মধ্যে কলেজের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য একটি ভবন বরাদ্দের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

এখন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর অপেক্ষা—৪৪ বছরের দীর্ঘ দাবি কবে বাস্তবে রূপ নেয়। স্থানীয় সংসদ সদস্যের উদ্যোগ, রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপে কর্ণফুলী আবদুল জলিল চৌধুরী কলেজ সরকারি হলে উপজেলার শিক্ষাক্ষেত্রে তা নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...