বিজ্ঞাপন
তিনি বলেছেন, যারা সম্পদ ধ্বংস করেছে, লুটপাট চালিয়েছে এবং ‘প্রজাতন্ত্রকে উৎখাতের চেষ্টা করেছে’, তাদের জবাবদিহি করতে হবে।
গতকাল রোববার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ম্যাক্রোঁ বলেন, সম্পদ ধ্বংসকারীদের এর মূল্য দিতে হবে। যারা লুটপাট করেছে, তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আর যারা প্রজাতন্ত্রকে উৎখাতের চেষ্টা করেছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
সহিংসতার জন্য তিনি ‘চরম বামপন্থি গোষ্ঠীর বিদ্রোহী উপাদান’ এবং তাদের সঙ্গে যোগ দেওয়া অপরাধীদের দায়ী করেন। সহিংসতার দৃশ্য দেখে ফরাসিদের মধ্যে ক্ষোভ ও লজ্জা তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তার ভাষায়, কোনো কিছুই এসব কর্মকাণ্ডের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।
তবে বিক্ষোভকারীদের সবাইকে সহিংসতার জন্য দায়ী করতে নিষেধ করেছেন ম্যাক্রোঁ। তিনি বলেন, অনেক মানুষ বৈধ দাবি নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। তাদের সঙ্গে ভাঙচুর ও সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।
জনগণের অভিযোগ ও দাবি শোনার ওপরও গুরুত্ব দেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। এ সপ্তাহে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধি ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। বৈঠকে বাস্তবসম্মত প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে।
নিহত দুই, আটক দুই হাজারের বেশি
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, সপ্তাহান্তের সংঘাতের ঘটনায় নঁত শহরে ২২ বছর বয়সি এক পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। প্যারিস থেকে প্রায় ২৫০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত শহরটিতে ওই পুলিশ সদস্য ‘তৃতীয় পক্ষের একটি গাড়ির ধাক্কায়’ প্রাণ হারান।
এ ছাড়া প্যারিসের উত্তরে এক বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়েছে। বিএফএমটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্যারিস পুলিশ সদর দপ্তরের বরাতে জানানো হয়েছে, ওই ব্যক্তির হৃদ্যন্ত্র ও শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ দুই হাজারের বেশি মানুষকে আটক করেছে। আহত হয়েছেন ছয় শতাধিক পুলিশ সদস্য। গতকাল রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বানের পর প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক চত্বরে আবারও জড়ো হন বিক্ষোভকারীরা। সেখানে পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস ছুড়তে দেখা যায় বলে জানিয়েছে বিএফএমটিভি।
দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় লিমোজ শহরে শনিবার ১৪৩ বছরের পুরোনো টাউন হলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ভিডিওতে ভবনটির চূড়া ভেঙে পড়তে দেখা গেছে। মার্সেই শহরে কালো পোশাক ও মুখোশ পরা বিক্ষোভকারীরা সিটি হলে ঢুকে ভাঙচুর চালান। লিয়োঁ শহরে আগুন দেওয়া হয় পর্যটন কার্যালয়ে।
সহিংসতায় ক্ষয়ক্ষতি সামাল দিতে সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে আইনপ্রণেতা ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের সমালোচনা বাড়ছে। বিএফএমটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু প্যারিস, লিয়োঁ ও মার্সেইয়ের মেয়রদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা মেরামতে আরো সহায়তা চেয়েছেন ওই মেয়ররা।
শনিবার রাতে প্যারিসের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ শেষ হওয়ার সময় তরুণদের কয়েকটি দল দোকানে লুটপাট চালায় ও আগুন ধরিয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে এবং লাঠিপেটা করে। খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ক্যারেফোরের প্রধান নির্বাহী আলেক্সান্দ্র বোমপার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, সহিংসতায় দেশজুড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী লেকর্নুও সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে একে ‘অগ্রহণযোগ্য মাত্রার সহিংসতা’ বলে উল্লেখ করেন।
শনিবার ম্যাক্রোঁও বলেন, পুলিশি প্রশাসনের কার্যালয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও টাউন হলে হামলা এবং লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
প্যারিস পুলিশ প্রিফেকচার এক বিবৃতিতে জানায়, দাঙ্গাকারী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলাকারীদের সামনে তারা পিছু হটবে না। তাদের কর্মীরা সাহস ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন বলেও দাবি করা হয়।
শিক্ষাব্যবস্থা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ
ফ্রান্সে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সূত্রপাত শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে। গত মাসে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে সরকারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। সরকারি বিদ্যালয়ের দুরবস্থা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ আন্দোলনকে আরো বিস্তৃত করেছে।
চলতি শরতে ফরাসি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো, শিক্ষকদের পেছনে ব্যয় বাড়ানো, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় উপযোগী অবকাঠামো নির্মাণ এবং তরুণদের বিরুদ্ধে পুলিশি সহিংসতা বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ করেন।
গত দেড় দশকে জন্মহার বৃদ্ধি এবং শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়ায় বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু শিক্ষকসংখ্যা কমেছে। ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে একাধিকবার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবে এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি।
শনিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজের হিসাবে, ফ্রান্সজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। তাদের মধ্যে প্যারিসে ছিলেন ১ লাখ ১০ হাজার। তবে আয়োজকদের দাবি, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।
প্যারিসে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া পলিন নামের এক নারী বলেন, সম্পদ ও ক্ষমতা এমনভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছে যে তা আর নিয়ন্ত্রণে নেই।
৩৬ বছর বয়সি এই বিক্ষোভকারী আরো বলেন, তরুণদের সমর্থন জানাতেও তারা রাস্তায় নেমেছেন। কিছু অর্জন থাকলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি সঠিক পথে এগোচ্ছে না।
লুইস নামের ৩৮ বছর বয়সি আরেক বিক্ষোভকারী বলেন, ম্যাক্রোঁর নেতৃত্বে গণতন্ত্র কমছে এবং ক্ষমতা আরো কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।
তার অভিযোগ, কয়েকজন ধনকুবের গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করছেন। পরিস্থিতি বদলাতে তারা আন্দোলন করছেন।
পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
বিক্ষোভ দমনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। সপ্তাহের শুরুর দিকে পুলিশের অভিযানে ১৪ বছর বয়সি এক কিশোরের চোয়াল ভেঙে যায়। এ ছাড়া উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় আলঁসোঁ শহরে এক পুলিশ সদস্যকে এক কিশোরীকে গলা চেপে ধরতে দেখা যায়। এ ধরনের কৌশল এখন আইনত নিষিদ্ধ।
শনিবার লিয়োঁ থেকে প্রায় ৪০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে সাঁত-এতিয়েন শহরে বিক্ষোভ চলাকালে এক ব্যক্তি হাত হারিয়েছেন বলে বিএফএমটিভিকে জানিয়েছে পুলিশের একটি সূত্র। চলমান শিক্ষার্থী বিক্ষোভে কোনো বিক্ষোভকারীর হাত হারানোর এটি দ্বিতীয় ঘটনা।
চলতি মাসের শুরুর দিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় লঁস শহরে এক শিক্ষার্থী গ্রেনেড কুড়িয়ে নেওয়ার পর তার হাত হারানোর খবর আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ এক ধরনের স্টান গ্রেনেডের ব্যবহার সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল। তবে অন্য কয়েক ধরনের গ্রেনেড ব্যবহারের অনুমতি বহাল ছিল। পরে ওই নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেওয়া হয়।
বিএফএমটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষের ‘বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ’ শান্তিপূর্ণ ছিলেন।
চরম বামপন্থি দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজের নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, রোববারও অধিকাংশ বিক্ষোভকারী শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি জানিয়েছেন।
তার ভাষায়, সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন শহরের সহিংসতার দৃশ্য প্রচারিত হলেও হাজার হাজার মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। তিনি পরিস্থিতিকে ‘দুটি জগৎ, দুটি বাস্তবতা’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
ইতালিসহ অন্য দেশেও সংহতি বিক্ষোভ
ফ্রান্সের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বেলজিয়াম, আলবেনিয়া ও ইতালিতেও বিক্ষোভ করেছেন তরুণ অধিকারকর্মীরা। ইতালির মিলান শহরে রোববার পরিচয় শনাক্ত করার জন্য ৭০ জনের বেশি মানুষকে আটক করে পুলিশ বলে জানিয়েছে সিএনএনের সহযোগী সংবাদমাধ্যম স্কাই টিজি২৪।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিলানে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো পাথর নিক্ষেপকারী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। লুটপাটের পর মিলানের একটি সুপারমার্কেটের জানালা ভাঙা এবং মেঝেতে পণ্য ছড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে বলে ভিডিও প্রকাশ করেছে স্কাই টিজি২৪।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে লুটপাটের নিন্দা জানিয়েছেন। বৈধ বিক্ষোভকে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা ছড়ানোর কাজে ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে আরো ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করতে সোমবার রোমে বৈঠক ডাকার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
সর্বশেষ
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...