Logo Logo

মাদ্রাসা শিক্ষক থেকে কোটি টাকার প্রতারক

গোপালগঞ্জে জাহিদের জালিয়াতিতে সর্বস্বান্ত অর্ধশতাধিক মানুষ


Splash Image

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার চরবয়রা গ্রামের মো. জাহিদুল ইসলাম (জাতীয় পরিচয়পত্র নং- ২৮১৯৬৭৯৯২৫), পিতা- মৃত ওবায়েদ শিকদার (গোপালগঞ্জ জেলা সঞ্চয় অফিসের সাবেক পিওন)-এর বিরুদ্ধে অভিনব কৌশলে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। কখনও চড়া সুদের লোভ দেখিয়ে, কখনও সরকারি চাকরির মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে, আবার কখনও নামমাত্র পুঁজিতে অধিক মুনাফার ব্যবসার প্রলোভন দেখিয়ে তিনি অসংখ্য মানুষকে প্রতারিত করেছেন। তাঁর এই চতুর প্রতারণার জাল থেকে ব্যাংক, এনজিও ও মাল্টিপারপাস সংস্থা যেমন রেহাই পায়নি, তেমনি রেহাই পায়নি এতিম, বিধবা, আইনজীবী, শিক্ষক ও সাধারণ চাকরিজীবীরাও। জাহিদের এই সুনিপুণ প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে আজ অর্ধশতাধিক মানুষ তাঁদের সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব ও সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন।


বিজ্ঞাপন


টুঙ্গিপাড়ার এমপিওভুক্ত গিমাডাঙ্গা নেছারিয়া ফাযিল মাদ্রাসার ইসলামের ইতিহাসের শিক্ষক মো. জাহিদুল ইসলাম। শিক্ষকতা পেশায় থাকলেও তার আড়ালে রয়েছে প্রতারণার এক বিশাল জাল। গোপালগঞ্জ পোস্ট অফিস মোড়ের এই পুরাতন বই ব্যবসায়ী নিজেকে কখনো কলেজের অধ্যাপক, কখনো প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, আবার কখনো আবাসন প্রতিষ্ঠান বা মাল্টিপারপাস কোম্পানির মালিক হিসেবে পরিচয় দেন। এসব ভুয়া পরিচয়ের সপক্ষে জাল নথিপত্র দেখিয়ে তিনি বিভিন্ন ব্যাংক, এনজিও এবং সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেন। আর এই বিশ্বাসকে পুঁজি করেই শুরু হয় তার সুকৌশলী অর্থ আত্মসাতের পরবর্তী ধাপ।

অভিযুক্ত জাহিদের বিরুদ্ধে ইউসিবি, অগ্রণী, স্ট্যান্ডার্ড ও গ্রামীণ ব্যাংকসহ বিসিকের মতো বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে জাল নথিপত্র ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ ঋণ উত্তোলন ও তা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। কেবল প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েই নয়, তিনি এতিম, বিধবা, আইনজীবী ও শিক্ষকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে অধিক মুনাফা বা চড়া সুদের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকেও মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।

অনুসন্ধানে জাহিদুল ইসলামের প্রতারণার আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। জানা গেছে, তিনি বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি প্রদান ও বদলির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের তদবির করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। বিশেষ করে, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক উপাচার্যের (ভিসি) আত্মীয় পরিচয় দিয়ে তিনি নিজের প্রভাব বিস্তার করতেন। এই ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি দেওয়া এবং ভর্তি করিয়ে দেওয়ার নাম করে তিনি বহু নিরীহ মানুষের সাথে প্রতারণা করেছেন।

প্রতারক জাহিদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে অতিষ্ঠ পাওনাদাররা নিরুপায় হয়ে ভিড় জমান তার দোকানের মালিকের কাছে। পোস্ট অফিস মোড়ে যে মার্কেটে জাহিদ পুরাতন বইয়ের ব্যবসা করতেন, সেখানে প্রতিনিয়ত পাওনাদারদের নালিশ ও বিশৃঙ্খলায় অতিষ্ঠ হয়ে এক পর্যায়ে দোকান মালিক তাকে উচ্ছেদ করে দেন। তবে দোকান হারানোর পর জাহিদের প্রতারণামূলক আচরণ আরও ভয়ংকর রূপ নেয়। পাওনা টাকা ফেরত দেওয়ার পরিবর্তে তিনি উল্টো ওই মার্কেট মালিককে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধামকি দিতে শুরু করেন। এমনকি মালিকের একমাত্র ছেলেকে অপহরণ ও সপরিবারে হত্যার হুমকি দিয়ে জাহিদ বর্তমানে ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত প্রতারক জাহিদ বর্তমানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে গা ঢাকা দিলেও তার অশুভ তৎপরতা থেমে নেই। বরং পলাতক থাকা অবস্থায় তিনি একটি শক্তিশালী প্রতারক চক্র গড়ে তুলেছেন। এই চক্রের অন্যতম প্রধান সহযোগী হিসেবে নাম এসেছে তার মামার, যিনি গোপালগঞ্জের সোনাকুড় এলাকার বাসিন্দা। পাওনাদাররা যখন পাওনা টাকার দাবিতে জাহিদের সন্ধানে যান, তখন তার এই মামা ঢাল হয়ে দাঁড়ান। স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে তিনি উল্টো পাওনাদারদের নানাবিধ ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদান করে তাড়িয়ে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া জাহিদের এই চক্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কতিপয় নিম্নস্তরের নেতাকর্মীদেরও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

বর্তমানে জাহিদ প্রতিনিয়ত নিজের অবস্থান পরিবর্তন করছেন এবং নতুন নতুন এলাকায় গিয়ে মানুষের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলছেন। নিজের মার্জিত কথাবার্তা ও ছদ্মবেশে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জন করে তিনি নানা অজুহাত বা মিথ্যা বিপদের কথা বলে পুনরায় বিপুল পরিমাণ অর্থ ধার নিচ্ছেন এবং তা আত্মসাৎ করছেন। তার এই ধারাবাহিক জালিয়াতি ও অনৈতিক কাজে চক্রের অন্যান্য সদস্যরা পর্দার আড়াল থেকে সক্রিয় সহযোগিতা প্রদান করছে।

ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, জাহিদুল ইসলামের কথা বলার ধরন অত্যন্ত মার্জিত ও বিশ্বাসযোগ্য হওয়ায় মানুষ খুব সহজেই তার ফাঁদে পা দেয়। তবে একবার টাকা হাতে পাওয়ার পর তিনি সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন এবং রাতারাতি স্থান পরিবর্তন করেন। তার এই নিখুঁত ও সুপরিকল্পিত প্রতারণার জালে পড়ে অনেক পরিবার আজ সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।

গোপন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, প্রতারক জাহিদ বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৫ থেকে ৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে তিনি নিজের গ্রামের বাড়িতে একটি আলিশান ভবন নির্মাণ করেছেন। শুধু তাই নয়, আত্মসাৎকৃত অর্থের একটি বড় অংশ তিনি হুন্ডির মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত তার ভাইয়ের কাছে পাচার করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

বর্তমানে জাহিদ নিজেও অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমানোর জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীরা গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। তারা প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছেন যেন দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রতারক জাহিদকে আইনের আওতায় আনা হয় এবং পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারসহ তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হয়।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...