Logo Logo

হরমুজ প্রণালি খুললেও তেল সংকট কেন এখনো কাটেনি?


Splash Image

ছবি : সংগৃহিত

৪০ দিনের লড়াইয়ের পর, বুধবার (৮ এপ্রিল) সকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। আগামী শুক্রবার (১০ এপ্রিল) পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনায় বসতে যাচ্ছে ওয়াশিংটন-তেহরান।


বিজ্ঞাপন


এই যুদ্ধবিরতির অন্যতম প্রধান দিক হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে পুনরায় জাহাজ চলাচল শুরু করা। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল এবং গ্যাস এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। তবে প্রণালিটি খুলে দেওয়া হলেও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট সমাধানের পথ এখনো অনেক দূরে- এমন তথ্যই উঠে এসেছে আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হলেও, বর্তমানে হাজার হাজার মাইল দূরে ছড়িয়ে থাকা বিশাল তেল ট্যাঙ্কারগুলোর উপসাগরীয় অঞ্চলে ফিরে আসতে এবং জলাধারে জমে থাকা লাখ লাখ ব্যারেল তেল সংগ্রহ করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে।

এছাড়া বন্ধ হয়ে যাওয়া কূপগুলো পুনরায় চালু করাটা ব্যয়বহুল ও জটিল। প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, খুব কম সংখ্যক ট্যাঙ্কার তেল বোঝাই বা খালাস করতে পারায় এবং তাদের উপকূলীয় মজুত পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদকরা তেলের কূপগুলো বন্ধ করতে শুরু করেছিলেন। এর ফলে আঞ্চলিক তেল উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এই কূপগুলো পুনরায় চালু করা কোনো সুইচ টেপার মতো সহজ কাজ নয়; এটি প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন এবং খুবই ব্যয়বহুল।

এসবের পাশাপাশি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা বিষয়ে নিশ্চয়তাও প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর এসব প্রকৃত প্রভাব সম্ভবত ২০২৬ সাল জুড়ে এবং ২০২৭ সালের শুরু পর্যন্ত বজায় থাকবে। এছাড়া যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া জ্বালানি অবকাঠামো মেরামত করতে উপসাগরীয় দেশগুলোর কয়েক বছর সময় লাগবে।

ইরান যুদ্ধের কারণে কী পরিমাণ তেল হারিয়েছে?

তথ্য ও বিশ্লেষণকারী সংস্থা কেপলার-এর শিপিং ডেটা বিশ্লেষণ করে আল জাজিরার ওপেন সোর্স ইউনিট জানিয়েছে, ইরাক, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সম্মিলিত রপ্তানি ফেব্রুয়ারি মাসের ৪৬৯ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে মার্চ মাসে ২৬৩ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে এসেছে। অর্থাৎ রপ্তানি ২০৬ মিলিয়ন ব্যারেল বা ৪৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

এই পতন তীব্র হলেও ছয়টি দেশের মধ্যে অসম ছিল; বন্দরের অবস্থান ও পাইপলাইনের বিকল্পের ওপর নির্ভর করে কিছু দেশ অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কোন তেল উৎপাদক দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?

ইরাকের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা ফেব্রুয়ারির ৯৪ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে মার্চে ১৭ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে এসেছে, অর্থাৎ ৮২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

কুয়েত এবং কাতার উভয়েই তাদের অপরিশোধিত তেল চালানের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ হারিয়েছে, যেখানে যথাক্রমে ৭৫ এবং ৭০ শতাংশ পতন ঘটেছে।

সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত যথাক্রমে ৩৪ এবং ২৬ শতাংশের একটি অপেক্ষাকৃত কম আনুপাতিক হ্রাস সামাল দিতে পেরেছে, যা হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলা ভাসমান মজুত ব্যবস্থা এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে আংশিকভাবে পূরণ করা হয়েছে।

ওমান ছিল এক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম। দেশটির অনেক বন্দর হরমুজ প্রণালির বাইরে অবস্থিত হওয়ায় তাদের রপ্তানি ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে (২৫ মিলিয়ন থেকে ২৯ মিলিয়ন ব্যারেল), যা সামগ্রিক ঘাটতি মেটাতে সামান্য সহায়তা করেছে।

২০৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল দিয়ে কতগুলো ট্যাঙ্কার পূর্ণ করা সম্ভব?

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর যে ২০৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল হারিয়েছে, তা দিয়ে প্রায় ১০৩টি ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি) পূর্ণ করা সম্ভব। এই সুপারট্যাঙ্কারগুলো বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তি।

ভিএলসিসি হলো সমুদ্রের অন্যতম বৃহত্তম এবং ভারী জাহাজ, যা বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহন করার জন্য তৈরি। এর চেয়ে বড় জাহাজ হলো আল্ট্রা লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ইউএলসিসি), যেগুলোর ধারণক্ষমতা প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল।

ইউএলসিসি জাহাজগুলো ভিএলসিসির তুলনায় কম দেখা যায়, কারণ এগুলোর গভীরতা অন্তত ২৪ মিটার (৮০ ফুট)। ফলে বিশ্বের বেশিরভাগ জলপথ এবং বন্দরে এই জাহাজগুলো চলাচল করতে পারে না।

ভিএলসিসি ট্যাঙ্কার কত বড়?

একটি ভিএলসিসি ট্যাঙ্কার লম্বায় প্রায় ৩৩০ মিটার (১,০৮০ ফুট), যা প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের উচ্চতার প্রায় সমান। যদিও কারিগরিভাবে কিছু যাত্রীবাহী জাহাজ এর চেয়ে লম্বা হতে পারে, তবে ওজন বহন করার ক্ষমতা ও পানির সরণ-এর দিক থেকে ভিএলসিসি-ই সবচেয়ে বড়। এগুলো সাধারণত ৫০-৬০ মিটার চওড়া হয় এবং পূর্ণ লোড অবস্থায় পানির নিচে ২০-২২ মিটার গভীরতায় থাকে।

এক ব্যারেল তেল থেকে কতটুকু পেট্রোল পাওয়া যায়?

এক ব্যারেল অপরিশোধিত তেলে ১৫৯ লিটার বা ৪২ ইউএস গ্যালন তেল থাকে। পরিশোধনের পর, সাধারণত এক ব্যারেল তেল থেকে প্রায় ৭৩ লিটার (১৯.৩৬ গ্যালন) পেট্রোল বা গ্যাসোলিন পাওয়া যায়। বাকি অংশ থেকে ডিজেল, জেট ফুয়েল এবং অন্যান্য পণ্য তৈরি হয়।

ব্যবহারিক উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আপনি যদি এমন একটি পিকআপ ট্রাক চালান যা প্রতি ১০০ কিলোমিটারে ১০ লিটার তেল খরচ করে, তবে এক ব্যারেল অপরিশোধিত তেল দিয়ে আপনি প্রায় ৭৩০ কিলোমিটার (৪৫০ মাইল) পথ পাড়ি দিতে পারবেন।

২০৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের মূল্য কত?

অপরিশোধিত তেলের মান নির্ধারণ করা হয় এর ঘনত্ব এবং সালফারের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে। কম সালফারযুক্ত তেলকে ‘সুইট ক্রুড’ বলা হয়, যা বেশি দামি কারণ এটি পরিশোধন করা সহজ।

বিশ্বজুড়ে তেলের মূল্যের মানদণ্ড বা বেঞ্চমার্ক হলো ‘ব্রেন্ট ক্রুড’, যা যুক্তরাজ্য ও নরওয়ের মাঝামাঝি উত্তর সাগর থেকে তোলা হয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মানদণ্ড হলো টেক্সাস থেকে উৎপাদিত ‘ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট’ (ডাব্লিউটিআই)।

তেল একটি বৈশ্বিক পণ্য হিসেবে কেনাবেচা হয়, যার অর্থ হলো বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটলে এর প্রভাব প্রতিটি দেশের ওপর পড়ে, তারা যেখান থেকেই তেল কিনুক না কেন।

যুদ্ধের অধিকাংশ সময় তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে ছিল এবং ২ এপ্রিল এটি সর্বোচ্চ প্রায় ১২৮ ডলারে পৌঁছেছিল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের গড় দাম ছিল ব্যারেল প্রতি প্রায় ৬৫ ডলার।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...