Logo Logo

দুর্নীতির বিষবাষ্প ও আমাদের নীরবতার দায়

সন্তানের মুখে কি জাহান্নামের আগুন তুলে দিচ্ছেন?


Splash Image

এআই দ্বারা নির্মিত প্রতিকী ছবি।

একটু চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো—আজ সকালে যে খাবারটি আপনি আপনার আদরের সন্তানের মুখে তুলে দিলেন, তাতে কোনো মজলুমের দীর্ঘশ্বাস মিশে নেই তো? যে বাড়িটির এসি রুমে বসে আপনি শান্তির ঘুম ঘুমাচ্ছেন, তার প্রতিটি ইটে রাষ্ট্রের কোনো দরিদ্র নাগরিকের হক চুরি করার পাপ লেগে নেই তো?


বিজ্ঞাপন


আমরা অনেকেই নিজেদের অত্যন্ত ধার্মিক মনে করি। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছি, হজ-ওমরাহ করছি, জুমার দিন মসজিদে প্রথম কাতারে বসার প্রতিযোগিতা করছি। কিন্তু দিন শেষে যখন অফিস বা ব্যবসার টেবিলে বসছি, তখন খুব সহজেই ঘুষের খামটি পকেটে ঢোকাচ্ছি অথবা অন্যের হক মেরে দিচ্ছি। আমরা নিজেদের প্রবোধ দিচ্ছি এই বলে যে—"সবাই তো করছে, আমি আর এমন কী করলাম!"

কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক এই ফাঁকি দিয়ে দুনিয়ার আদালতকে হয়তো বোকা বানানো যায়, মহাবিশ্বের স্রষ্টাকে নয়। দুর্নীতি আজ কেবল বাংলাদেশের অর্থনীতিকেই গিলে খাচ্ছে না; এটি আমাদের ঈমান, বিবেক এবং পরকালকে তিলে তিলে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

পরকালের ভয়াবহ সাজা:
যে সম্পদ রেখে যাবেন, তার হিসাব কে দেবে?

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে 'কগনিটিভ ডিসোন্যান্স'—আমরা জানি দুর্নীতি করা পাপ, তবু নিজের চুরিকে যৌক্তিক প্রমাণ করার চেষ্টা করি। কিন্তু ইসলাম এই মনস্তাত্ত্বিক ভণ্ডামির কোনো সুযোগ রাখেনি।

রাসূলুল্লাহ (সা.) একবার সাহাবীদের প্রশ্ন করেছিলেন, "তোমরা কি জানো প্রকৃত দেউলিয়া কে?" এরপর তিনি বুঝিয়েছিলেন, কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তি পাহাড়সম সালাত, সিয়াম ও জাকাতের নেকি নিয়ে হাজির হবে। কিন্তু সে দুনিয়াতে কাউকে গালি দিয়েছিল, কারো সম্পদ আত্মসাৎ করেছিল, কারো রক্ত ঝরিয়েছিল। তখন তার সব নেকি সেই পাওনাদারদের দিয়ে দেওয়া হবে। নেকি শেষ হয়ে গেলে মজলুমদের পাপ তার ঘাড়ে চাপিয়ে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সহিহ মুসলিম)।

আপনার ঘুষের টাকায় গড়া সাম্রাজ্য কি আপনার এই পরিণতি ঠেকাতে পারবে?

রাষ্ট্রীয় বা জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করাকে ইসলামে 'গুলুল' বলা হয়। পবিত্র কোরআনে সতর্ক করা হয়েছে, যারা অবৈধ সম্পদ সঞ্চয় করে, কিয়ামতের দিন সেই সম্পদ বিষধর সাপের রূপ ধারণ করে তাদের গলায় পেঁচিয়ে দেওয়া হবে। হারাম উপার্জনে গঠিত শরীর জান্নাতে প্রবেশ করবে না। যে ব্যক্তি হারাম খায়, হারাম পরে, তার কোনো ইবাদত বা কান্নাকাটি আল্লাহর দরবারে পৌঁছায় না।

একবার ভেবে দেখুন, যে স্ত্রী-সন্তানের সুখের জন্য আপনি দুর্নীতি করে টাকার পাহাড় গড়ছেন, মৃত্যুর পর তারা আপনার সেই টাকা ভোগ করবে ঠিকই, কিন্তু কবরের অন্ধকার প্রকষ্ঠে শাস্তির আগুন পোহাতে হবে কেবল আপনাকে একাই। কেউ আপনার পাপের ভাগ নেবে না। যে স্ত্রী সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের জন্য আপনি দূর্নীতি ও হারামের সাথে সম্পর্ক রেখেছিলেন দুনিয়ায়, আপনার মৃত্যুর পরে তারা সেই অপরাধের কোন দায় নিবে না। জাহান্নামের কঠিন শাস্তি ভগ করতে হবে শুধু আপনাকেই।

দুর্নীতিবাজরা একা কখনো সমাজকে ধ্বংস করতে পারে না, যদি না সাধারণ মানুষ তাদের নীরব সমর্থন দেয়। একজন সচেতন নাগরিক ও মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব কেবল নিজে সৎ থাকা নয়, বরং অন্যায়ের প্রতিবাদ করা।

১. হারামের প্রতি সামাজিক ঘৃণা তৈরি করা: আমরা দুর্নীতিবাজদের এড়িয়ে চলার বদলে তাদের অনুষ্ঠানে যাই, তাদের সালাম দিই, সমাজে তাদের সম্মান করি। এই মনস্তত্ত্ব ভাঙতে হবে। একজন সৎ পিয়ন অনেক বেশি সম্মানের দাবিদার একজন দুর্নীতিগ্রস্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার চেয়ে। হারাম উপার্জনকারীকে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।

২. অন্যায়ের প্রতিবাদ : পবিত্র আল কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, 'আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার' (الأمر بالمعروف والنهي عن المنكر) - যার অর্থ হলো "সৎ কাজের আদেশ করা এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা" - সূরা আলে ইমরান: ১১০ - ইসলামের স্পষ্ট বিধান হলো—অন্যায় দেখলে হাত দিয়ে বাধা দাও, তা না পারলে মুখ দিয়ে প্রতিবাদ করো, আর অন্ততপক্ষে অন্তর দিয়ে সেই কাজটিকে ঘৃণা করো (যা ঈমানের দুর্বলতম স্তর)। আপনি যখন ঘুষ দেওয়াকে "সিস্টেমের দোষ" বলে মেনে নিচ্ছেন, তখন আপনি আসলে অন্যায়কে সমর্থন করে নিজের ঈমানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন।

৩. নাগরিক অধিকার নিয়ে সোচ্চার হওয়া: রাষ্ট্রের সম্পদ মানে আপনার, আমার এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্পদ। কেউ যখন মেগা প্রকল্পে বা ব্যাংকে লুটপাট করে, তখন সে আপনার পকেট থেকেই টাকা চুরি করে। নাগরিক হিসেবে এই চুরির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা, আইনি ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে থেকে প্রতিবাদ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

কাফনের কাপড়ে কোনো পকেট থাকে না। পৃথিবীতে কেউ হাজার বছর বেঁচে থাকার গ্যারান্টি নিয়ে আসেনি। তাই আজই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করুন—আপনি কি একজন সৎ মানুষ হিসেবে কবরে যেতে চান, নাকি জনগণের সম্পদ লুণ্ঠনকারী একজন দুর্নীতিবাজ হিসেবে আল্লাহর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে চান?

দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধটা শুরু হোক নিজের ঘর থেকে, নিজের বিবেক থেকে। কারণ, রাষ্ট্র বদলাতে হলে সবার আগে নিজেকে বদলাতে হয়।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...