Logo Logo

সাম্রাজ্যবাদ কি শেষ হয়েছে, নাকি শুধু ভাষা বদলেছে?


Splash Image

একসময় সাম্রাজ্যবাদ মানেই ছিল দূরদেশে সৈন্য পাঠিয়ে ভূখণ্ড দখল, সম্পদ লুট এবং মানুষের ওপর সরাসরি শাসন প্রতিষ্ঠা। আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বহু অঞ্চল এভাবেই ইউরোপীয় শক্তির নিয়ন্ত্রণে গিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উপনিবেশগুলো স্বাধীন হয়, পুরোনো সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে, আর মনে হতে থাকে— সাম্রাজ্যবাদ বুঝি ইতিহাসের বিষয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি তা শেষ হয়েছে? নাকি শুধু তার ভাষা, কৌশল ও মুখোশ বদলেছে?


বিজ্ঞাপন


সাম্রাজ্যবাদের মূল অর্থ হলো— একটি শক্তিধর রাষ্ট্রের অন্য রাষ্ট্র বা জনগোষ্ঠীর ওপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক কিংবা সাংস্কৃতিক আধিপত্য। আগে এর সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপ ছিল উপনিবেশ। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে সেই আধিপত্য আর সবসময় পতাকা উড়িয়ে আসে না, আসে ঋণ, নিষেধাজ্ঞা, সামরিক জোট, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা, কূটনৈতিক চাপ এবং নৈতিক ভাষার আড়ালে।

এই বদলে যাওয়া ভাষাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একসময় উপনিবেশবাদকে ন্যায্যতা দিতে বলা হতো সভ্যতা দান বা শ্বেতাঙ্গের দায়। আজ তার জায়গায় এসেছে গণতন্ত্র রক্ষা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, মানবিক হস্তক্ষেপ কিংবা আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার মতো শব্দ। অবশ্যই সব আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপকে ভণ্ডামি বলা যাবে না। কিন্তু সমস্যা তখনই, যখন নৈতিকতার ভাষা শক্তিধর রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থকে আড়াল করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

আধুনিক ভূরাজনীতির কয়েকটি উদাহরণ এই প্রশ্নটিকে আরও স্পষ্ট করে। ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন হামলার পক্ষে প্রধান যুক্তি ছিল— সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল “মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা”র বয়ান। কিন্তু পরে যখন সেই দাবির সত্যতা পাওয়া গেল না, তখন প্রশ্ন উঠল— এই যুদ্ধের পেছনে আসল চালিকাশক্তি কী ছিল? মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান— এসব কি তার অংশ ছিল না? আফগানিস্তানেও ৯/১১–এর পর সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে শুরু হওয়া সামরিক হস্তক্ষেপ ধীরে ধীরে দীর্ঘমেয়াদি বহিরাগত প্রভাবের জটিল কাঠামোয় রূপ নেয়। বর্তমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতাও দেখায়— আজকের বিশ্বে শক্তির রাজনীতি আর কেবল সীমান্তের প্রশ্ন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জ্বালানি, নিরাপত্তা, সামরিক জোট এবং প্রভাববলয় রক্ষার প্রতিযোগিতা।

আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ শুধু যুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও এখন বড় নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র। ঋণনীতি, বাণিজ্যচুক্তি, নিষেধাজ্ঞা, ডলারের প্রভাব, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা— এসবের মাধ্যমে শক্তিধর রাষ্ট্র দুর্বল রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একইভাবে রাজনৈতিক প্রভাব, সরকার পরিবর্তনের রাজনীতি, এমনকি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বয়ানও আধিপত্যের অংশ হয়ে উঠতে পারে। কোন যুদ্ধ ন্যায়সংগত, কোন প্রতিরোধ সন্ত্রাস আর কার নিরাপত্তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ— এসব প্রশ্নের উত্তরও অনেক সময় ক্ষমতার ভারসাম্য ঠিক করে দেয়।

অবশ্য সব আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বা মানবিক হস্তক্ষেপকে সাম্রাজ্যবাদ বলা যাবে না। কিন্তু যখন নৈতিক ভাষার আড়ালে কৌশলগত স্বার্থ লুকিয়ে থাকে, যখন দুর্বল রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব সংকুচিত হয়, যখন অর্থনৈতিক বা সামরিক নির্ভরতা চাপিয়ে দেওয়া হয়— তখন “সাম্রাজ্যবাদ” ধারণাটি আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

সাম্রাজ্যবাদ হয়তো আর পুরোনো ঔপনিবেশিক পোশাকে ফিরে আসে না, কোনো ভাইসরয় রাজধানীতে বসে না, বিদেশি পতাকাও খুব কম উড়ে। কিন্তু ক্ষমতা, স্বার্থ, ভাষা ও নিয়ন্ত্রণের যে রাজনীতি একসময় উপনিবেশবাদকে চালিত করেছিল, তার অনেক উপাদান আজও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সক্রিয়। সাম্রাজ্যবাদ সম্ভবত শেষ হয়নি, শুধু তার ভাষা বদলেছে।

নাম : আঞ্জুমান আরা জুঁই।

বিভাগ : ইতিহাস

সেশন : ২০২৪-২০২৫

কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...