বিজ্ঞাপন
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের স্বপ্ন বা পেশাগত আকাঙ্ক্ষা কখনোই একাকী বা বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে ওঠে না। এটি মূলত ব্যক্তির সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া, অর্থনৈতিক বাস্তবতার চাপ, সামাজিক মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রের সামগ্রিক কাঠামোগত নীতির একটি সম্মিলিত ফল। শৈশবে পেশা নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি থাকে বেশ ভাবাবেগপূর্ণ ও মহৎ। তখন একজন পেশাজীবীকে সমাজ কীভাবে দেখে, সেটিই প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ায়। শৈশবে তরুণরা সাধারণত পেশাকে সামাজিক মর্যাদা ও সেবার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। একজন চিকিৎসক জীবনের রক্ষক, প্রকৌশলী উন্নয়নের রূপকার, কৃষিবিদ খাদ্য নিরাপত্তার কারিগর আর প্রশাসনিক কর্মকর্তা রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিনিধি।
তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে, বিশেষ করে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পেরিয়ে যখন একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় পা রাখে, তখন শৈশবের সেই ভাবাবেগের সাথে মুখোমুখি সংঘাত শুরু হয় কঠিন বাস্তবতার। তরুণরা বুঝতে শেখে, কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ বা ভালোবাসা দিয়ে পেশা নির্বাচন করা যায় না। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে চাকরির স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা, সময়মতো পদোন্নতি, উপযুক্ত বেতন-ভাতা, সামাজিক প্রভাব, কাজের সুস্থ পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ অগ্রগতির সম্ভাবনা সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক এই পর্যায়ে শুরু হয় ব্যক্তিমানুষের 'লালিত স্বপ্ন' ও 'কাঠামোগত বাস্তবতার' মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত।
বর্তমানে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে একটি বিশেষ প্রবণতা খুব সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল, কৃষি বা অন্যান্য বিশেষায়িত কারিগরি বিষয়ে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম ও বিপুল সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগের পর পড়াশোনা শেষ করেও বিপুলসংখ্যক তরুণ সাধারণ ক্যাডারে (যেমন— প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্র) যোগ দিতে প্রবলভাবে আগ্রহী হচ্ছেন। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে এটি আরো স্পষ্ট হয়। গত কয়েকটি বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা গেছে, প্রশাসন বা পুলিশের মতো সাধারণ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্তদের একটি বড় অংশই চিকিৎসা ও প্রকৌশল ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থী। এমনকি বিশেষায়িত ক্যাডারে চাকরি পাওয়ার পরও অনেকে পরবর্তী বিসিএসে পুনরায় অংশ নেন শুধুমাত্র সাধারণ ক্যাডারে রূপান্তরের (Cadre Change) আশায়। এই পেশা পরিবর্তনের ঘটনাকে কেবল কতিপয় ব্যক্তির 'ব্যক্তিগত ইচ্ছে' হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর জটিল হিসাব-নিকাশ।
সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করা বেশ সহজ। সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইম (Émile Durkheim) তাঁর তত্ত্বে দেখিয়েছিলেন, সমাজের মূল কাঠামো বা অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি যখন বদলায়, তখন মানুষের সামাজিক ভূমিকা ও পেশাগত আকাঙ্ক্ষাও পরিবর্তিত হতে বাধ্য। ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber)-এর সমাজতত্ত্ব অনুযায়ী, সমাজিক ক্ষমতা (Power), মর্যাদা (Status) এবং অর্থনৈতিক সুবিধা (Economic Opportunity)— এই তিনটি উপাদান পেশা নির্বাচনের ক্ষেত্রে মানুষের সিদ্ধান্তকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। অন্যদিকে, পিয়ের বুরদ্যু (Pierre Bourdieu)-র সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মূলধনের (Social and Cultural Capital) তত্ত্বও নিশ্চিত করে যে, ব্যক্তির স্বপ্ন মূলত তাঁর চারপাশের সুযোগ-সুবিধার সমীকরণ দ্বারাই নির্ধারিত হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ওয়েবার ও বুরদ্যুর তত্ত্ব বাস্তবতার সাথে অনেকাংশে মিলে যায়। আজ একজন মেধাবী শিক্ষার্থী যখন বছরের পর বছর কঠিন পড়াশোনা শেষ করে নিজ নিজ পেশায় প্রবেশ করেন, তখন তিনি দেখতে পান, রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় কারিগরি বা বিশেষায়িত পেশাজীবীদের নেতৃত্বের সুযোগ ও নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নীতিনির্ধারণ, প্রকৌশল ও অবকাঠামোগত মূল পরিকল্পনা কিংবা কৃষিনীতির শীর্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণের চেয়ারে প্রায়শই বিশেষায়িত ক্যাডারের স্বকীয় ক্ষমতার অভাব দেখা যায়।
বিপরীতে, সাধারণ ক্যাডার বিশেষ করে প্রশাসন, পুলিশ ও পররাষ্ট্র সার্ভিস কেবল একটি চাকরি নয়; বরং এটি সামাজিক ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ, সময়মত পদোন্নতি, রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক সুরক্ষার অন্যতম প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে একজন চিকিৎসক বা প্রকৌশলী যখন অনুভব করেন যে নিজ পেশায় নিজের সর্বোচ্চ মেধা ও শ্রম দেওয়ার পরও তিনি কাঠামোগত কারণে নীতিনির্ধারণের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারবেন না, তখন তাঁর অবচেতন মন নিজস্ব পেশার প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে। এটি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের একটি বিশাল অপচয়; যে মেধা তৈরিতে রাষ্ট্র লাখ লাখ টাকা খরচ করল, নীতিনির্ধারণে বৈষম্যের কারণে সেই মেধার সঠিক ব্যবহার সুনিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের অনীহাই ফুটে ওঠে।
আমাদের এখন সময় এসেছে শৈশবের সেই অতিপরিচিত প্রশ্ন "তোমার জীবনের লক্ষ্য কী?" এটিকে একটি ব্যক্তিগত অনুভূতির খোলস থেকে বের করে রাষ্ট্রীয় মানসম্পন্ন মানবসম্পদ নীতির অংশ হিসেবে দেখার। শিক্ষাব্যবস্থা ও পেশাগত সুযোগের মধ্যে ভারসাম্য আনতে নিচের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন:
১. জাতীয় স্বেচ্ছাসেবী সেবা (National Volunteer Service): বাংলাদেশে একজন শিক্ষার্থীকে কম বয়সে (১৫-১৬ বছর বয়সে) বিজ্ঞান, মানবিক বা ব্যবসায় শিক্ষার মতো বড় সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে সঠিক হয় না। উচ্চমাধ্যমিকের পর ১ থেকে ২ বছরের একটি বাধ্যতামূলক বা উৎসাহমূলক 'জাতীয় স্বেচ্ছাসেবী সেবা' চালু করা যেতে পারে। এই সময়ে তরুণরা শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ সুরক্ষা কিংবা সমাজসেবামূলক কাজে সরাসরি যুক্ত থাকবে। এর ফলে তারা সমাজকে বাস্তবের চোখে দেখতে পারবে, নিজের সত্যিকারের ঝোঁক ও সক্ষমতা অনুধাবন করবে এবং পরিপক্ক চিন্তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করবে।
২. বিষয় পরিবর্তনের নমনীয়তা (Flexibility in Higher Education): বিশ্বমানের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বাংলাদেশেও প্রথম ১ বা ২ বছর সাধারণ ও বুনিয়াদি শিক্ষা প্রদানের পর শিক্ষার্থীদের নিজস্ব মেধা ও আগ্রহের ভিত্তিতে চূড়ান্ত বিষয় নির্বাচনের সুযোগ দেওয়া উচিত। এতে অকাল ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ক্যারিয়ারমুখী হতাশা অনেকটাই কমে যাবে।
৩. পরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট শিক্ষা বিনিয়োগ (Targeted Investment in Education): আগামী ২০, ৩০ বা ৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরে কতজন চিকিৎসক, কতজন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ, কতজন প্রকৌশলী, কৃষি বিজ্ঞানী বা গবেষক প্রয়োজন তার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বা 'জাতীয় মানবসম্পদ মাস্টারপ্ল্যান' তৈরি করা প্রয়োজন। সেই চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সংখ্যা, সরকারি বৃত্তি এবং গবেষণার অর্থায়ন নিরূপণ করা উচিত।
৪. বিশেষায়িত পেশার প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী ক্ষমতায়ন: প্রতিটি বিশেষায়িত খাতের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী পদগুলো সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। একজন চিকিৎসক যেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও নীতি কাঠামোর সর্বোচ্চ পদে পৌঁছাতে পারেন, একজন প্রকৌশলী যেন অবকাঠামো উন্নয়নের মূল নেতৃত্বের চেয়ারে বসতে পারেন এবং একজন কৃষিবিদ যেন দেশের সামগ্রিক কৃষিনীতির নেতৃত্ব দিতে পারেন, এমন একটি আকর্ষনীয় ক্যারিয়ার ট্র্যাক গঠন করা সমায়ের দাবী।
৫. নিয়োগে আন্তঃবিষয়ক ও বাস্তবমুখী দক্ষতার মূল্যায়ন: বিসিএসসহ সমস্ত সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কেবল মুখস্থনির্ভর সাধারণ জ্ঞান বা ধরাবাঁধা সিলেবাসের বাইরে গিয়ে সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা (Problem Solving Skills), নেতৃত্ব, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং নীতি-বিশ্লেষণের দক্ষতাকে বেশি প্রাধান্য দিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর জনবল কাঠামোর একটি নীতিগত দিক বিবেচনা করা যেতে পারে। তারা উচ্চমাধ্যমিকের পর যোগ্য ও মেধাবী তরুণদের প্রারম্ভিক ক্যাডেট হিসেবে নির্বাচন করে এবং পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানের চাহিদা ও ব্যক্তির সক্ষমতা অনুযায়ী উচ্চশিক্ষা ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রদান করে। বেসামরিক প্রশাসনের কাঠামো ভিন্ন হলেও "আগে মেধাবী জনবল নির্বাচন, পরে প্রয়োজনভিত্তিক উচ্চতর দক্ষতা উন্নয়ন" এই নীতিগত ধারণা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা হতে পারে। তবে কোনো মডেল হুবহু অনুসরণের প্রস্তাব নয় এটি মানবসম্পদ উন্নয়নের একটি চিন্তার খোরাক।
পরিশেষে, "আমার জীবনের লক্ষ্য" কেবল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মুখস্থ রচনা কিংবা পরীক্ষার খাতায় নম্বর পাওয়ার কোনো বিষয় নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন দর্শন ও বৈষম্যহীন দূরদর্শিতার প্রতিফলন। রাষ্ট্র যদি প্রতিটি বিশেষায়িত পেশাকে সঠিক মর্যাদা, উপযুক্ত পদোন্নতির সুযোগ এবং নীতিনির্ধারণের স্বাধীন ক্ষেত্র তৈরি করে দিতে পারে, তবেই একজন প্রকৌশলী নতুন প্রযুক্তির গবেষণায়, একজন চিকিৎসক চিকিৎসা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে এবং একজন কৃষিবিদ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজের সেরাটা দেওয়ার স্বপ্ন দেখবেন। পেশা পরিবর্তন তখন আর কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা থেকে বাঁচার তাগিদে হবে না; তা হবে ব্যক্তির নিজস্ব ও স্বাধীন ইচ্ছার এক সুস্থ বহিঃপ্রকাশ।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...