বিজ্ঞাপন
এ ঘটনায় উদ্ধার করা ক্যাবলের মালিকানা যাচাই, জব্দ করা মালামাল ফেরতের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্যের অসংগতি নিয়েও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। তবে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ অক্টোবর রাতে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কথিত চোরাই ক্যাবল কেনাবেচার সময় ক্রেতা ও বিক্রেতা হিসেবে পরিচিত দিল আহমদ (৪০) ও মো. কাইয়ুম (৩৮) নামের দুই ব্যক্তিকে ক্যাবলসহ আটক করেন কর্ণফুলী থানার এএসআই মো. মিজানুর রহমান। পরে তাঁদের উদ্ধার করা ক্যাবলসহ থানায় নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানা গেছে।
কর্ণফুলী থানা পুলিশের প্রকাশিত প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আটক দিল আহমদ ও মো. কাইয়ুমকে কর্ণফুলী থানার নন-এফআইআর প্রসিকিউশন নম্বর ২৩৯/২০২৬, তারিখ ১৩ অক্টোবর ২০২৬, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৮-এর ৮৮ ধারায় আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে এএসআই মো. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ৪০ হাজার টাকা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ক্যাবলসহ দুই ব্যক্তিকে আটকের পর তাঁদের বিরুদ্ধে চুরিসংক্রান্ত নিয়মিত মামলা না করে অপেক্ষাকৃত ভিন্ন আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতে পাঠানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই অর্থ লেনদেন করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত চুরির মামলা না দিয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ অধ্যাদেশের ৮৮ ধারায় নন-এফআইআর প্রসিকিউশন দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের পেছনে কথিত আর্থিক লেনদেনের কোনো প্রভাব ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ ছাড়া একই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এর আগেও আসামি আটককে কেন্দ্র করে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে কর্ণফুলী থানার এএসআই মো. মিজানুর রহমান দুই ব্যক্তিকে আটকের বিষয়টি স্বীকার করেন।
তিনি জানান, দুই ব্যক্তিকে আটকের পর তদন্ত করে তাঁদের কাছে থাকা ক্যাবল নিজেদের মালামাল বলে প্রমাণিত হয়েছে।
আটক ব্যক্তিরা বর্তমানে কোথায় রয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁরা হয়তো বাড়িতে রয়েছেন।
উদ্ধার করা ক্যাবলের বিষয়ে জানতে চাইলে এএসআই মিজানুর রহমান জানান, মালামাল এখনো থানায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হয়তো সন্ধ্যার পর এসে তা নিয়ে যাবেন।
তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি জানান, তাঁদের নামে কোনো মামলা হয়নি। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও অস্বীকার করেন।
তবে কর্ণফুলী থানা পুলিশের প্রকাশিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, আটক দুই ব্যক্তিকে ইতোমধ্যে নন-এফআইআর প্রসিকিউশনের মাধ্যমে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে এএসআই মিজানুর রহমান নিয়মিত মামলা না হওয়ার কথা জানালেও আটক ব্যক্তিদের আদালতে পাঠানোর আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়টি তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করেননি।
যদিও নিয়মিত মামলা ও নন-এফআইআর প্রসিকিউশন পৃথক আইনি প্রক্রিয়া, তবুও ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাওয়ার পর আদালতে পাঠানোর তথ্য উল্লেখ না করায় তাঁর বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর আহমদ জানান, দুই ব্যক্তিকে আটকের পর তদন্তে উদ্ধার করা ক্যাবল তাঁদের দোকানের মালামাল বলে সত্যতা পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা তাঁকে জানিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরার কারণে তাঁদের চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ অধ্যাদেশের ৮৮ ধারায় আদালতে পাঠানো হয়েছে।
এএসআই মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসা করবেন।
তবে ক্যাবলের মালিকানা নিশ্চিত করতে কী ধরনের নথিপত্র যাচাই করা হয়েছে এবং সন্দেহজনক ঘোরাফেরার অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি কী ছিল, তা পাওয়া তথ্য থেকে স্পষ্ট হয়নি।
ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী উদ্ধার করা ক্যাবল আটক ব্যক্তিদের নিজস্ব মালামাল বলে তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে। অথচ তাঁদের সন্দেহজনক ঘোরাফেরার অভিযোগে ৮৮ ধারায় আদালতে পাঠানো হয়েছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, আটক ব্যক্তিদের কাছে থাকা ক্যাবল বৈধ মালামাল হিসেবে নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন দেওয়ার সুনির্দিষ্ট আইনগত ভিত্তি কী ছিল?
ক্যাবলগুলো যদি তাঁদের নিজস্ব দোকানের মালামাল হয়ে থাকে, তাহলে আটকের সময় চোরাই মালামাল হিসেবে সন্দেহ করার কারণ কী ছিল? আবার সেই সন্দেহ দূর হওয়ার পরও তাঁদের আদালতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত কোন পরিস্থিতিতে নেওয়া হয়েছে?
এ ছাড়া উদ্ধার করা ক্যাবলের মালিকানা যাচাইয়ের জন্য কোনো ক্রয় রসিদ, ব্যবসায়িক নথি, চালান কিংবা সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।
ক্যাবল উদ্ধারের পর আনুষ্ঠানিক জব্দতালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল কি না এবং মালামাল ফেরতের ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি বা অন্য কোনো আইনগত প্রক্রিয়া প্রয়োজন ছিল কি না, তা যাচাই করা জরুরি।
পুরো ঘটনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে।
প্রথমত, কথিত চোরাই ক্যাবলসহ দুই ব্যক্তিকে আটকের পর চুরিসংক্রান্ত নিয়মিত মামলা না করার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হলো?
দ্বিতীয়ত, উদ্ধার করা ক্যাবল আটক ব্যক্তিদের বৈধ মালামাল হিসেবে নিশ্চিত হওয়ার পরও সন্দেহজনক ঘোরাফেরার অভিযোগে তাঁদের আদালতে পাঠানোর সুনির্দিষ্ট কারণ কী?
তৃতীয়ত, এএসআই মিজানুর রহমান আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা হয়নি বলে জানালেও নন-এফআইআর প্রসিকিউশনের মাধ্যমে আদালতে পাঠানোর বিষয়টি কেন স্পষ্ট করেননি?
চতুর্থত, উদ্ধার করা ক্যাবলের মালিকানা নিশ্চিত করতে কী ধরনের কাগজপত্র যাচাই করা হয়েছে এবং মালামাল ফেরতের সিদ্ধান্ত কোন প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছে?
পঞ্চমত, এএসআই মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা কথিত ৪০ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগের সঙ্গে নিয়মিত মামলা না করার সিদ্ধান্তের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না?
ষষ্ঠত, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগগুলো যাচাই করতে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে কি না?
তবে শুধু নিয়মিত চুরির মামলা না করে নন-এফআইআর প্রসিকিউশন দেওয়ার ঘটনাকে অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান, আটকের পরিস্থিতি, পুলিশের তদন্ত এবং আদালতে দাখিল করা নথিপত্র পর্যালোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্তটির আইনগত ভিত্তি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
একদিকে উদ্ধার করা ক্যাবল আটক ব্যক্তিদের বৈধ মালামাল বলে পুলিশের দাবি, অন্যদিকে তাঁদের সন্দেহজনক ঘোরাফেরার অভিযোগে আদালতে পাঠানো এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৪০ হাজার টাকা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা না করার সিদ্ধান্ত, ৮৮ ধারায় প্রসিকিউশন এবং উদ্ধার করা ক্যাবল ফেরতের প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে আটক ও প্রসিকিউশনের নথি, ক্যাবলের মালিকানাসংক্রান্ত কাগজপত্র, জব্দতালিকা এবং মালামাল ফেরতের সিদ্ধান্ত যাচাই করা জরুরি।
পাশাপাশি এএসআই মো. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা ৪০ হাজার টাকা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগসহ অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছ তদন্তেই স্পষ্ট হতে পারে, পুরো ঘটনায় পুলিশ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে, নাকি কোনো অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।
অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অবস্থান পরিষ্কার করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
সর্বশেষ
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...