বিজ্ঞাপন
আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। প্রতিবছরের মতো এই দিনেও পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা এবং একটি টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অঙ্গীকার করা হচ্ছে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপনে এবারের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে “Inspired by Nature. For Climate. For Our Future”; যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে “প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণা: জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য” স্লোগানে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালিত হচ্ছে।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী দেশগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এর সবচেয়ে মারাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাতের মুখোমুখি। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা দিন দিন বাড়ছে, লবণাক্ততা দ্রুত বিস্তার লাভ করছে, এবং অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা মানুষের চিরচেনা জীবনযাত্রাকে আমূল বদলে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি দেশজুড়ে তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্বও বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের উপকূলীয় এলাকায় কাজ করতে গিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ' (সিআইপিআরবি)-এর কাছে অনেক কঠিন, জটিল ও অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা ধরা পড়েছে। সংস্থাটি তাদের বিশেষ ‘নিরাপদে ভাসা’ প্রকল্পের মাধ্যমে নিবিড়ভাবে জানার চেষ্টা করেছে যে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের এই তীব্র প্রভাব কীভাবে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ সংক্রান্ত সামাজিক কার্যক্রমগুলোকে বাধাগ্রস্ত করছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের অকাল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে পানিতে ডুবে যাওয়া। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকি ও শিশুমৃত্যুর হার কমাতে দেশে দীর্ঘদিন ধরে 'আঁচল' (বিশেষ শিশু যত্নকেন্দ্র) এবং 'সুইমসেফ' (জীবন রক্ষাকারী সাঁতার শিক্ষা) ও জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। এই সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে এ পর্যন্ত হাজার হাজার শিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যুর হাত থেকে জীবন রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে উপকূলের সামগ্রিক বাস্তবতা খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের প্রভাব শিশুদের ওপর প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ, ধারাবাহিক এবং আন্তঃসম্পর্কিত সংকটের সৃষ্টি করছে। একটি ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস, কয়েক দিনের একটানা ভারী বর্ষণ কিংবা আকস্মিক জলোচ্ছ্বাসে গ্রামীণ কাঁচা রাস্তাঘাট তলিয়ে যায় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় 'আঁচল' কেন্দ্রগুলো নিয়মিতভাবে পরিচালনা করা হাসপাতাল বা মাঠকর্মীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে গ্রামীণ পরিবারগুলো তাদের জীবিকা রক্ষা, ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়া কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে চতুষ্পদী ব্যস্ত থাকে। ফলে অবুঝ শিশুদের ওপর বাবা-মায়ের সার্বক্ষণিক নজরদারি অনেকটাই কমে যায়। অন্যদিকে বন্যা বা জলোচ্ছ্বাসের কারণে চারপাশে জমে থাকা পানি, প্লাবিত ফসলি জমি, উন্মুক্ত খাল, ডোবা কিংবা পুকুরগুলো শিশুদের জন্য নতুন বিপদের উৎস হয়ে ওঠে। এর বাইরেও তীব্র তাপদাহ এবং বন্যা-পরবর্তী বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের কারণে শিশুরা এই সমস্ত সুরক্ষাসেবা থেকে মারাত্মকভাবে বঞ্চিত হয়।
সাধারণত “প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণা” বলতে আমরা কেবল বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান কিংবা পরিবেশ সচেতনতামূলক সভার কথাই বুঝে থাকি। অবশ্যই এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে প্রকৃতি থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রকৃত অর্থ আরও অনেক বেশি বিস্তৃত। এর আসল উদ্দেশ্য হলো— পরিবর্তিত প্রাকৃতিক বাস্তবতাকে সঠিকভাবে বোঝা, নতুন ঝুঁকিগুলোকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে চিহ্নিত করা এবং স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন ও ভৌগোলিক গুরুত্ব অনুযায়ী টেকসই সমাধান তৈরি করা।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উপকূলের মানুষ প্রকৃতির সাথে লড়াই করে এবং খাপ খাইয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে আসছে। আজ জলবায়ু পরিবর্তনের এই চরম সংকটকালে মানুষের সেই চিরন্তন অভিযোজনের ধারণাকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে আরও শক্তিশালী, আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।
জলবায়ুজনিত তীব্র দুর্যোগের মধ্যেও কীভাবে শিশু সুরক্ষা এবং পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ কার্যক্রম শতভাগ সচল রাখা যায়, তা নিয়ে বর্তমানে যৌথভাবে কাজ করছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা 'রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউশন' (RNLI) এবং দেশের খ্যাতনামা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিআইপিআরবি। মাঠপর্যায়ে এই সমন্বিত উদ্যোগের সফলতা পাওয়া গেলে, পরবর্তীতে এসব লব্ধ অভিজ্ঞতা ও মডেল দেশব্যাপী প্রয়োগের এক বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত শিশু সুরক্ষা ও বিকাশ কার্যক্রমকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। দেশের নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী পরিচালিত 'আইসিবিসি' প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি বর্তমানে চলমান রয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন এবং শিশু সুরক্ষার পারস্পরিক সম্পর্ককে রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় আরও বেশি গুরুত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে তাই আজ আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হচ্ছে— আমরা কি শুধু প্রকৃতির বাহ্যিক ক্ষতি কমানোর গৎবাঁধা কথা ভাবব, নাকি প্রকৃতির এই পরিবর্তিত ও বৈরী বাস্তবতায় মানবজীবন, বিশেষ করে আমাদের আগামী প্রজন্ম ও শিশুদের জীবন রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথাও গুরুত্বের সাথে ভাবব?
এই প্রশ্নের প্রকৃত ও বাস্তবসম্মত উত্তর হয়তো উপকূলের সেই মায়ের কাছেই আছে, যিনি প্রতিদিন আকাশের কালো মেঘের দিকে তাকিয়ে প্রকৃতির ভাষা ও নির্মম বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করেন। প্রকৃতি আজও আমাদের প্রতিনিয়ত শিক্ষা দিচ্ছে; তবে প্রশ্ন হলো— ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সুন্দর ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আমরা কি প্রকৃতির সেই শিক্ষা গ্রহণ করতে আন্তরিকভাবে প্রস্তুত?
লেখক- মোঃ আবুল বরকাত, উপ-পরিচালক, সিআইপিআরবি।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
সর্বশেষ
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...