Logo Logo

কর্ণফুলীতে খাল পুনঃখনন প্রকল্পে নয়ছয়, ২৫ লাখ টাকা কার পকেটে?


Splash Image

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ও চরপাথরঘাটা ইউনিয়নে দুটি খাল পুনঃখনন প্রকল্পে সরকারি বরাদ্দ, প্রাক্কলিত ব্যয়, শ্রমিক মজুরি ও উপকরণ কেনাকাটায় একাধিক গরমিল ও অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সরকারি নথির তথ্যের সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এবং যুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য ও পরিসংখ্যানে বড় ধরনের ব্যবধান পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে প্রকল্প দুটিতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার অনিয়ম বা আর্থিক নয়ছয় হয়ে থাকতে পারে বলে স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে দাবি করা হচ্ছে।


বিজ্ঞাপন


তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে কর্ণফুলী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সুজন কান্তি দাশ দাবি করেছেন, প্রকল্পে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়ম ঘটেনি।

নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, শিকলবাহা খাল পুনঃখনন প্রকল্পের দৈর্ঘ্য ৩ কিলোমিটার (আলী হোসেন মার্কেট থেকে শিকলবাহা জিলানি গ্যাস পাম্প পর্যন্ত)। এতে শ্রমিক মজুরি বাবদ ৩৮ লাখ ৩৬ হাজার ৬১০ টাকা, নন-ওয়েজ খাতে ৩৮ লাখ ৮৭ হাজার ৯ ৩৩ টাকা এবং শ্রমিক সর্দার ভাতা ৪ হাজার ৩০০ টাকাসহ মোট বরাদ্দ দেখানো হয় ৭৭ লাখ ২৮ হাজার ৮৪২ টাকা। কিন্তু পিআইও সুজন কান্তি দাশের দাবি, প্রকল্পটির মোট বরাদ্দ ছিল প্রায় ৬৬ লাখ টাকা। ফলে নথির হিসাবের সঙ্গে কর্মকর্তা সুজন কান্তির দেয়া বক্তব্যে প্রায় ১১ লাখ ২৮ হাজার ৮৪২ টাকার অসংগতি ধরা পড়েছে।

পিআইও সুজন কান্তি দাশ জানান, ভ্যাটসহ শিকলবাহা খালের প্রকল্পে প্রায় ২৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে, যার মধ্যে মূল কাজের ব্যয় ২৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় অবশিষ্ট প্রায় ৩৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। যদিও ওই অর্থ ফেরতের চালান বা অফিসিয়াল নথি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

কাজের মূল্য প্রদানের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে তিন ধরণের ভিন্ন তথ্য। শিকলবাহা প্রকল্পে কাজ করা শ্রমিক সর্দার আলী আকবরের পাওনা বা পরিশোধ নিয়ে পিআইওর হিসাবে সাড়ে ৩ লাখ টাকা, ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের তথ্যমতে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং আলী আকবরের নিজস্ব দাবি অনুযায়ী প্রাপ্তি ২ লাখ ৫ হাজার টাকা। অপর শ্রমিক সর্দার মোহাম্মদ জাফরের ক্ষেত্রেও পিআইও জানান তাঁকে ১৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ইউপির হিসাব বলছে তিনি পেয়েছেন ১৩ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। এ ক্ষেত্রেও প্রায় ২ লাখ ৬৪ হাজার টাকার পার্থক্য রয়ে গেছে।

প্রকল্পে ৩০টি পাইপ স্থাপনের কথা থাকলেও বাস্তবে বসানো হয়েছে ১৮টি। ইউনিয়ন পরিষদের হিসাব অনুযায়ী পাইপ খাতে খরচ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা হলেও পিআইও দাবি করছেন এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪ লাখ টাকা। বাজারদর অনুযায়ী প্রতি পাইপ ৭ হাজার টাকা হলে স্থাপন খরচসহ মোট ব্যয় হওয়ার কথা সর্বোচ্চ ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এর বাইরে শ্রমিকদের নামে ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে অর্থ আত্মসাৎ ও তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত শ্রমিক কাজ না করার অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদিকে চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের খোয়াজনগর থেকে দোনের খাল পুনঃখনন প্রকল্পের সরকারি নথিতে বরাদ্দ ধরা হয়েছিল ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৭ টাকা (ওয়েজ কস্ট ৬৩ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪৯ টাকা ও নন-ওয়েজ কস্ট ৬৪ লাখ ৭৯ হাজার ৮৮৮ টাকা)। তবে পিআইও সুজন কান্তি দাশ প্রথমে প্রকল্পের বরাদ্দ ১ কোটি ২ লাখ টাকা দাবি করলেও পরবর্তীতে আবার ১ কোটি ২০ লাখ টাকার কথা জানান। সরকারি নথি ও পিআইওর দাবির মধ্যে এতে প্রায় ৮ লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৭ টাকার গরমিল পাওয়া যায়।

খোয়াজনগর খাল পুনঃখননের দায়িত্বপ্রাপ্ত চরপাথরঘাটা ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক শেখ আহমেদ জানান, তিনি কাজের বিল বাবদ ৯০ হাজার টাকা পেয়েছেন। খরচ পোষাতে না পারায় কাজ বন্ধ রেখেছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। খালের ব্রীজঘাট অংশের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাঈন উদ্দিন জানান, তিনি কাজের মজুরি বাবদ ১ লাখ টাকা পেয়েছেন, তবে তাঁর আরও টাকা পাওনা রয়েছে। নতুন অর্থবছর শুরু হওয়ায় কাজ বন্ধ করে ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা মোট খরচের পর অবশিষ্ট অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয় বলে পিআইও জানান।

সামগ্রিকভাবে ২টি খাল পুনঃখনন প্রকল্পের মোট সরকারি বরাদ্দ ছিল ২ কোটি ৬ লাখ ৭ হাজার ৩৭৯ টাকা। অথচ কর্মকর্তাদের দেয়া বক্তব্যে সেখান থেকে প্রায় ২০ লাখ ৭ হাজার ৩৭৯ টাকার তথ্যের কোনো সুস্পষ্ট মিল পাওয়া যায়নি।

এমতাবস্থায় প্রকল্প দুটির মেজারমেন্ট বুক, বিল-ভাউচার, ব্যাংক লেনদেন, শ্রমিকদের চূড়ান্ত তালিকা ও সরেজমিন কাজের পরিমাপ যাচাইপূর্বক একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন কারিগরি-আর্থিক নিরীক্ষা বা তদন্তের জোর দাবি উঠেছে।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...