Logo Logo

তিন আসামির জবানবন্দি

আইফোনের লোভে অপ্রতিমকে হত্যার ছক, ৭ দিন আগেই করা হয় পরিকল্পনা


Splash Image

ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। ছবি: সংগৃহীত

আইফোন দিয়ে ছবি তোলা ও টিকটক তৈরির মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল পরিচয়। সেই পরিচয়ই একপর্যায়ে পরিণত হয় ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে। আইফোনটি হাতিয়ে নেওয়ার লোভে ঘটনার সাত দিন আগেই করা হয় হত্যার পরিকল্পনা। ছবি তোলার কথা বলে ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায় নিয়ে প্রথমে তার আইফোন নেওয়া হয়। পরে ফোন ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে কোদালের হাতল দিয়ে মাথায় আঘাত করা হলে মৃত্যু হয় অপ্রতিমের।


বিজ্ঞাপন


কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতিম হত্যা মামলায় তিন আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এমন তথ্য উঠে এসেছে। পরিকল্পনা, অপ্রতিমকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, আইফোন হাতে নেওয়া এবং তাকে আঘাত করার বিষয়ে তিন আসামির বক্তব্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের সময়ের ঘটনাপ্রবাহ বর্ণনায় কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।

অপ্রতিম ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই কিশোর ২০ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তিন জবানবন্দির মধ্যে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে সবচেয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন তুহিন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ-ছয় মাস ধরে অপ্রতিমের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। তার বন্ধু সিয়ামের মোটরসাইকেলে করে ছবি তোলা ও টিকটক করার জন্য অপ্রতিম তাদের সঙ্গে বের হতো।

তুহিন জবানবন্দিতে বলেন, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তার ও অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত এক কিশোরের লোভ তৈরি হয়। ঘটনার আগের শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের কিছুটা সামনে তাদের দুজনের দেখা হয়। সেখানেই আইফোন নেওয়া এবং অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে তুহিনের দাবি।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত ওই কিশোরের জবানবন্দিতেও আগের শুক্রবারের ওই বৈঠকের কথা এসেছে। তবে সে পরিকল্পনার দায় মূলত তুহিনের ওপর দিয়েছে। তার বক্তব্য, ‘তুহিন আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে মারার প্ল্যান করে।’

তৃতীয় জবানবন্দিতে অপর কিশোর জানিয়েছে, ঘটনার দিন বিকেলে তার বন্ধু তাকে পরিকল্পনার কথা জানায়। তাকে বলা হয়, তুহিনের সঙ্গে মিলে আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হবে।

অর্থাৎ, তিন জবানবন্দির একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল হলো—হত্যার সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক ছিল না। আইফোনকে কেন্দ্র করে আগে থেকেই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে তিনজনের বক্তব্যেই উঠে এসেছে।

তুহিনের জবানবন্দিতে আরও জানা যায়, হত্যার আগের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ময়নামতির একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। অপ্রতিম তাকে নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা দেয়। ওই রাতেই তুহিন টিকটকে অপ্রতিমকে মেসেজ করেন। পরে অপ্রতিম একটি মুঠোফোন নম্বর দিলে সেই নম্বরে কথা হয়। পরদিন জুমার নামাজের পর দেখা করার সিদ্ধান্ত হয়।

তুহিনের বর্ণনা অনুযায়ী, অপ্রতিম তার বাবার দোকানে কর্মরত ওই কিশোরকেও একই সময়ে আসতে বলেছিল। তাদের ছবি তোলার কথা ছিল। এই ছবি তোলার সম্পর্ককেই শেষ পর্যন্ত অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়—তিন আসামির জবানবন্দিতে এমন বর্ণনাই পাওয়া গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, অপ্রতিমের চেয়ে ৫ থেকে ১০ বছরের বড় যুবকদের সঙ্গে তার মেলামেশা ও সম্পর্ককে তারা ‘অসম বন্ধুত্ব’ হিসেবে দেখছেন।

১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা তুহিন জানিয়েছেন। এরপর অপ্রতিমকে ‘বুদ্ধি দিয়ে’ সানন্দা পশ্চিমপাড়ার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। তুহিনের জবানবন্দিতে জায়গাটিকে তার চাচা শাহ আলমের পাহাড় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটি জানিয়েছে, বেলা দুইটার পর কোটবাড়ির বোর্ড মার্কেট এলাকায় তার সঙ্গে অপ্রতিমের দেখা হয়। পরে সন্ধ্যার আগমুহূর্তে সে তার আরেক কিশোর বন্ধুকে নিয়ে পাহাড়ে যায়। সেখানে যাওয়ার আগেই সে বন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানায়।

তৃতীয় কিশোরের বর্ণনাও প্রায় একই। সে জানায়, বেলা ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে একটি স্কুলের সামনে তার সঙ্গে ওই কিশোরের দেখা হয়। সেখানেই তাকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। এরপর বিকেল চারটার পর তারা পাহাড়ে যায় এবং সেখানে অপ্রতিম ও তুহিনকে বসে থাকতে দেখে।

চারজন একত্র হওয়ার পর কিছু সময় গল্প ও আড্ডা হয়—এ বিষয়েও তিন জবানবন্দির বর্ণনায় মিল রয়েছে।

দোকানে কর্মরত কিশোরটি জবানবন্দিতে বলেছে, সে অপ্রতিমের কাছে ফোন চাইলে অপ্রতিম সেটি তাকে দেয়। কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর সে ফোনটি তুহিনের হাতে তুলে দেয়।

তুহিনের জবানবন্দিতেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। ওই কিশোর অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোন নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর সেটি আর অপ্রতিমকে ফেরত না দিয়ে তুহিনের হাতে দেয়। এরপর ফোন নিয়ে অপ্রতিম ও তুহিনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। পুলিশও এর আগে জানিয়েছিল, অপ্রতিম আইফোনটি নেওয়ার চেষ্টা করলে তুহিন বাধা দেন। এরপরই তাকে মারধরের ঘটনা ঘটে।

পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তিন আসামির বক্তব্যের মিল রয়েছে—অপ্রতিমকে প্রথম আঘাত করেন তুহিন। প্রথমে তাকে একটি থাপ্পড় মারেন তিনি। পরে পাশে পড়ে থাকা কোদালের হাতল নিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেন। এরপর অন্য দুজনকে মারতে বলেন।

দোকানে কর্মরত কিশোরটির জবানবন্দিতেও বলা হয়েছে, তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের ঝগড়ার পর তুহিন পাশে পড়ে থাকা কোদালের হাতল দিয়ে প্রথমে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেন। তৃতীয় কিশোরও বলেছে, তুহিনই প্রথম ওই হাতল দিয়ে অপ্রতিমকে আঘাত করেন।

তিন জবানবন্দির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে। তুহিন বলেছেন, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তাদের লোভ হয়েছিল।

দ্বিতীয় কিশোর তার জবানবন্দিতে আরও স্পষ্ট করে বলেছে, ‘আমাদের প্ল্যান ছিল, তুহিন ওই মোবাইল বিক্রি করে আমাকে টাকার ভাগ দিবে। এই জন্যই এই কাজ করা।’

তৃতীয় কিশোরও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে। তার ভাষ্য, আইফোনটি বিক্রি করে তাকে টাকার ভাগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

অপ্রতিমের মৃত্যুর পর কে কোথায় ছিলেন, সে বিষয়ে তিন জবানবন্দিতে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তুহিন বলেছেন, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর অন্য দুজন একদিকে চলে যায় এবং তিনি অন্যদিকে গিয়ে বাসায় ফেরেন। দ্বিতীয় জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর দুই কিশোর একসঙ্গে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। তখন তুহিন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তৃতীয় কিশোরও জানিয়েছে, সে ও তার বন্ধু একসঙ্গে চলে আসে এবং তুহিন অন্যদিকে চলে যান। তবে অপ্রতিমের আইফোন শেষ পর্যন্ত তুহিনের কাছেই ছিল—তিনজনের বয়ানেই এমন তথ্য উঠে এসেছে।

তুহিনের জবানবন্দিতে তার বন্ধু মো. সিয়াম (১৯) সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে। তুহিনের ভাষ্য, হত্যার পর বাসায় ফিরে তিনি সিয়ামকে ফোন করে ডেকে আনেন এবং তাকে ‘সব কথা খুলে বলেন’। হত্যার পরিকল্পনার কথা সিয়াম আগে থেকেই জানতেন বলেও তুহিনের জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে।

তবে অন্য দুই আসামির জবানবন্দিতে হত্যার আগের পরিকল্পনার সঙ্গে সিয়ামের সম্পৃক্ততার কোনো তথ্য নেই। পরে পুলিশ সিয়ামকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।

পুলিশের ভাষ্য ছিল, সিয়াম সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি; তবে ঘটনার কথা জানার পর তা গোপন করেছিলেন। পুলিশ সূত্র জানিয়েছিল, হত্যার দিন রাতেই তুহিন তার সঙ্গে দেখা করে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত জানান।

জবানবন্দিতে হত্যার পরের দিনের ঘটনাপ্রবাহও উঠে এসেছে। তুহিন বলেছেন, হত্যার পরদিন সকালে অপ্রতিমের মামা তাকে ফোন করে অপ্রতিমের খোঁজ করেন। এরপর তিনি সিয়ামকে নিয়ে কোটবাড়িতে অপ্রতিমকে খুঁজতে যান।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটি জানিয়েছে, পরদিন সে অপ্রতিমের বাবার এক সহকারীর সঙ্গে অপ্রতিমকে খুঁজেছে। পরে মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে সেও ঘটনাস্থলে যায়।

অন্য কিশোর জানিয়েছে, মরদেহ উদ্ধারের পর সে ও তার বন্ধু সন্ধ্যায় ফেসবুকে অপ্রতিমের মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দেয়। এরই মধ্যে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে তুহিনকে শনাক্ত করে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর অন্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরে তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়।

২০ সেপ্টেম্বর তিন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর পুলিশ জানিয়েছিল, তাদের দেওয়া বক্তব্য অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের সঙ্গে যাচাই করা হবে। হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।

তিন আসামির জবানবন্দি পাশাপাশি রাখলে অপ্রতিমের সঙ্গে তাদের পরিচয়, আইফোনের প্রতি লোভ, পূর্বপরিকল্পনা, নির্জন পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, ফোন হাতে নেওয়া এবং এরপর হামলার মূল ঘটনাক্রমে বেশ কিছু মিল পাওয়া যায়। তবে হত্যাকাণ্ডে কার ভূমিকা কতটা ছিল, সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে।

যে বিকেলে ছবি তোলার কথা বলে মাত্র ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিম বাসা থেকে বের হয়েছিল, সেই বিকেলের ঘটনার পূর্ণ সত্য উদ্‌ঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত হওয়াই এখন তার পরিবার, সহপাঠী ও কুমিল্লার মানুষের প্রত্যাশা।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...