মিছিলের সামনে পাঞ্জাবি পড়া আওয়ামী লীগের সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেনের একান্ত সচিব আতিকুর রহমান রুবেল।
বিজ্ঞাপন
বিশেষ করে সম্প্রতি ঝালকাঠি জেলা জজ আদালতে সরকারি আইন কর্মকর্তা নিয়োগকে কেন্দ্র করে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে সভায় বক্তারা জানান। তাদের অভিযোগ, দলের দুঃসময়ে যারা রাজপথে ছিলেন, মামলা-মোকদ্দমা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে এখন তারাই উপেক্ষিত হচ্ছেন।
মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর) ঝালকাঠি শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এসব অভিযোগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ হোসেনের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সরকারি সহকারী ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার। বিশেষ অতিথি ছিলেন ঝালকাঠি-২ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো। জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট শাহাদাত হোসেনের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য দেন ঝালকাঠি সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এজাজ আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক খোকন মল্লিক, পৌর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট নাজমুল হাসান, জেলা বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট শামীম আলম ও অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান মুবিনসহ অনেকে।
সভায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি জীবা আমীনা আল গাজী বলেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপির নেতাকর্মীরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অথচ এখন আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা পুনর্বাসিত হচ্ছেন, আর বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন হচ্ছে, জাতীয় পার্টি পুনর্বাসন হচ্ছে, কিন্তু বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীরা কোথাও ঠাঁই পাচ্ছেন না। দল ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু সুবিধা ভোগ করছে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা—এটা হতে দেওয়া যায় না।”
জীবা আমীনা আরও অভিযোগ করেন, তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন আওয়ামী লীগের ঠিকাদারদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদের কাজ দেওয়া হচ্ছে, অথচ বিএনপির নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। তিনি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়নের আহ্বান জানান এবং এ বিষয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনার কথাও উল্লেখ করেন।
ঝালকাঠি জেলা জজ আদালতে সরকারি আইন কর্মকর্তা নিয়োগের প্রসঙ্গ তুলে জীবা আমীনা বলেন, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সৈয়দ হোসেন এবং পৌর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট নাসিমুল হাসানকে সরকারি আইন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ না দিয়ে এমন ব্যক্তিদের পদায়ন করা হয়েছে, যারা দলের দুঃসময়ে পাশে ছিলেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, “এভাবে চলতে থাকলে দলের দুর্দিনে কোনো কর্মীকে কাছে পাওয়া যাবে না। এটা আর সহ্য করা হবে না।”
তার ভাষ্য, দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলনে যারা মারধর, নির্যাতন, গাড়ি ভাঙচুর, জেল-জুলুম ও রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হয়েছেন, তাদের বাদ দিয়ে যারা আন্দোলনে দৃশ্যমান ছিলেন না, তারা কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হচ্ছেন—এ প্রশ্নের জবাব প্রয়োজন। তিনি জানান, বিষয়টি দলের চেয়ারম্যানের কাছে তুলে ধরবেন।
সভায় অন্য বক্তারাও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তাদের দাবি, সম্প্রতি জেলা জজ আদালতে সরকারি তিনজন পাবলিক প্রসিকিউটর, অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর ও সহকারী সরকারি আইন কর্মকর্তা, জিপিও-এজিপি পদে ২৭ জন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হলেও বিএনপির ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের অনেকেই সেখানে বাদ পড়েছেন।
রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া উপজেলাতেও ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করার অভিযোগ উঠেছে। রাজাপুরের তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ঝালকাঠি-১ আসনের এমপি রফিকুল ইসলাম জামালের ‘১১ খলিফা’ হিসেবে পরিচিত যুবদলের নেতাকর্মীরাই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। অন্য নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ তাদের।
উপজেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক সুমন হক জুয়েল অভিযোগ করেন, রাজাপুরে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রস্তুতি সভায় শুধু উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুল হক নান্টু ও উপজেলা যুবদলের নেতাকর্মীদের নিয়ে কর্মসূচি করা হয়। মূল প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানেও উপজেলা বিএনপির পদধারী অনেক নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি এবং ব্যানারেও তাদের নাম রাখা হয়নি।
তার অভিযোগ, দলের দুর্দিনে যারা ছিলেন, তাদের বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বা বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়ে শাহজাহান ওমরের সঙ্গে নৌকার নির্বাচন করা ব্যক্তিদের নিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হয়েছে।
রাজাপুরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে খাবারের বিরানি প্যাকেট বিতরণ নিয়েও অভিযোগ ওঠে। সুমন হক জুয়েলের দাবি, প্রায় দেড় হাজারের বেশি মানুষ খাবার না পেয়ে চলে গেছেন। দুপুরের মধ্যেই খাবার ভাগযোগ করে খাওয়া এবং কিছু প্যাকেট অন্যত্র রেখে পরে রাতে নেতাদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। খাবার না পেয়ে কয়েকজন নেতাকর্মী উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং এ নিয়ে মারামারির ঘটনাও ঘটে বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে রাজাপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ওমর ফারুক সুমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বর্তমান উপজেলা বিএনপি ও যুবদলের রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
তিনি লেখেন, “নিজের ব্যক্তিত্ব ও সম্মানের কথা বিবেচনা করে এবং অসাংগঠনিক কার্যক্রমের প্রতি তীব্র নিন্দা ও ঘৃণা ব্যক্ত করে বর্তমান উপজেলা বিএনপি এবং যুবদলের সকল রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলাম। ভবিষ্যতে যদি কখনো সাংগঠনিক রাজনীতি চর্চা শুরু হয় তখন আবার ফিরবো ইনশাআল্লাহ!”
তার এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করেও স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
কাঁঠালিয়াতেও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, ঝালকাঠি জেলা ওলামা লীগের সদস্য সচিব ক্বারি নেয়ামত উল্লাহকে ৫ আগস্টের পর বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্মবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জামাল এমপি বিএনপিতে এনে কাঁঠালিয়া উপজেলা ওলামা দলের আহ্বায়ক করেন।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগের সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেনের একান্ত সচিব আতিকুর রহমান রুবেলকেও বিএনপিতে এনে বিভিন্ন কর্মসূচিতে সঙ্গে রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আতিকুর রহমান রুবেলের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের আমলে নৌকার মিছিলের ব্যানার এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিলে একই রঙের পাঞ্জাবি পরা ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীরা।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, যারা দীর্ঘদিন বিএনপির পক্ষে আইনি লড়াই করেছেন এবং রাজনৈতিক মামলায় দলের নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদেরও যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের ত্যাগ, মামলা-হামলা ও নির্যাতনের ইতিহাস বিবেচনায় না নিয়ে সুবিধাবাদী কিংবা অনুপ্রবেশকারীদের গুরুত্ব দেওয়া হলে দলের প্রকৃত ত্যাগীদের মধ্যে হতাশা আরও বাড়বে। এতে সাংগঠনিক ভিত্তিও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় বক্তারা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তৃণমূলের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানান। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে যারা পাশে ছিলেন, তাদের মূল্যায়ন না হলে ভবিষ্যতে দলের কঠিন সময়ে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তবে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, নির্যাতিত নেতাকর্মীদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। ওই তালিকা অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারি চাকরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের পুনর্বাসন করা হবে।
তিনি বলেন, “আমাদের মধ্যে বিভেদ ভুলে যেতে হবে। দলের সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মী পর্যায়ক্রমে মূল্যায়ন করা হবে। জেলাকে ঢেলে সাজানো হবে।”
দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে ত্যাগী নেতাকর্মীদের বঞ্চিত করা এবং অন্য দল থেকে আসা ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসায় ঝালকাঠির বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। দলীয় ঐক্যের কর্মসূচিতেই তৃণমূলের এমন প্রকাশ্য ক্ষোভকে সাংগঠনিক নেতৃত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...