উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা দুলাল মিয়া ও গুদাম কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম।
বিজ্ঞাপন
জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (১৪ মে) দিবাগত রাত প্রায় ১০টার দিকে মদন উপজেলার নেত্রকোনা-মদন সড়কের সাম্য ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে সরকারি চালবোঝাই একটি ট্রাক জব্দ করে প্রশাসন। এ সময় ট্রাকচালক ও হেলপারকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে শুক্রবার সকালে এ ঘটনায় মদন থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অনুমোদিত বিভিন্ন প্রকল্পের (কাবিখা ও জিআর) আওতায় বরাদ্দ পাওয়া চাল মদন উপজেলা খাদ্য গুদাম থেকে প্রকল্প সভাপতি ও ডিও হোল্ডারদের কাছে সরবরাহের কথা ছিল। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে গুদাম কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম ৬৬৭ বস্তা চাল বুঝিয়ে দেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৭ লাখ টাকা।
এজাহারে আরও বলা হয়, গুদাম কর্মকর্তা জরুরি কাজে ঈশ্বরগঞ্জের আঠারোবাড়ি এলাকায় যাওয়ার সুযোগে ট্রাকচালক শামীম, হেলপার শাহীন ও স্থানীয় ব্যবসায়ী এনামুল হক আনারের যোগসাজশে চালগুলো বারহাট্টার বাউসী এলাকার একটি অটোরাইস মিলে পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছিল। পরে স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রশাসন অভিযান চালিয়ে ট্রাকটি আটক করে।
এই ঘটনায় ট্রাকচালক শামীম (৩০), হেলপার মো. শাহীন (৩৫) ও ব্যবসায়ী মো. এনামুল হক আনারকে (৬০) আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ৮ থেকে ১০ জনকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মামলায় বাদী হয়েছেন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা দুলাল মিয়া এবং সাক্ষী করা হয়েছে গুদাম কর্মকর্তা মাহমুদুল আলমকে।
তবে মামলার পর থেকেই স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, গুদামের চালের হিসাব ও তদারকির মূল দায়িত্ব খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের ওপর বর্তায়। তাদের সম্পূর্ণ অজান্তে ও পরোক্ষ সহযোগিতা ছাড়া এত বিপুল পরিমাণ সরকারি চাল গুদাম থেকে বের হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাদ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, টিআর-কাবিখাসহ বিভিন্ন প্রকল্পের ডিও গত এপ্রিল মাসেই শেষ হয়েছে। চলতি মে মাসে এসব প্রকল্পে কোনো নতুন ডিও অনুমোদন করা হয়নি। তাছাড়া সাধারণত একেকটি প্রকল্পে দেড় থেকে দুই মেট্রিকটনের বেশি চাল বরাদ্দ দেওয়া হয় না। সেখানে একসঙ্গে প্রায় ২০ মেট্রিকটন চাল পরিবহনের বিষয়টি অত্যন্ত সন্দেহজনক।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রকল্পের ডিও অনুযায়ী চাল তিন দিনের মধ্যে উত্তোলনের নিয়ম থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে গুদামে চাল মজুত রাখা হয়েছিল এবং ধারণা করা হচ্ছে সেই চালই পাচারের চেষ্টা করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, খাদ্য বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও অসাধু ব্যবসায়ীদের যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি চাল নিয়ে অনিয়ম চলছিল। এখন নিজেদের অপরাধের দায় এড়াতে সাধারণ চালক ও হেলপারকে সামনে আনা হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গুদাম কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম কোনো স্পষ্ট বক্তব্য না দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। অন্যদিকে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা দুলাল মিয়াও এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে ইতোমধ্যে আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাওলিন নাহার বলেন, প্রকল্পের চাল ডিও হোল্ডারদের কাছে বিতরণের পর সেগুলো অন্যত্র সরানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল। খবর পেয়ে প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে চালগুলো জব্দ করে। খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হবে।
এদিকে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মোয়েতাছেমুর রহমান জানান, চলতি মে মাসে এসব প্রকল্পের কোনো নতুন ডিও হয়নি। গত এপ্রিল মাসের ডিও অনুযায়ী বরাদ্দকৃত চাল গুদামে ছিল এবং সেগুলোই পরে উত্তোলন করা হয়। বিষয়টি অনিয়মের মধ্যে পড়লেও অনেক সময় বিভিন্ন কারণে এমন পরিস্থিতির তৈরি হয়।
তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে এবং তদন্তে কারও সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিললে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...